হিট স্ট্রোক এড়াতে কীভাবে শরীর ঠান্ডা রাখবেন

দেশজুড়ে চলছে তীব্র তাপদাহ। এই গরমে সবচেয়ে বেশি যে স্বাস্থ্যঝুঁকিটি আমাদের তাড়া করে বেড়াচ্ছে, তা হলো ‘হিট স্ট্রোক’। চিকিৎসকদের মতে, প্রচণ্ড গরমে শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে হিট স্ট্রোক হয়। এটি একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা, যা সময়মতো প্রতিরোধ বা চিকিৎসা না করালে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তবে সঠিক জীবনযাত্রা, পরিমিত খাদ্যতালিকা এবং সামান্য কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলেই এই তীব্র গরমেও শরীরকে সতেজ ও হিট স্ট্রোকের হাত থেকে মুক্ত রাখা সম্ভব।
হিট স্ট্রোকের পূর্বলক্ষণগুলো কী কী?
হিট স্ট্রোক হঠাৎ করেই হয় না; এর আগে শরীর কিছু সংকেত দেয়, যাকে ‘হিট এক্সহশচন’ (Heat Exhaustion) বলা হয়। লক্ষণগুলো চিনে রাখা জরুরি:
১. তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরানো বা ঝিমঝিম করা।
২. অতিরিক্ত মাত্রায় ঘাম হওয়া অথবা হঠাৎ ঘাম বন্ধ হয়ে ত্বক লাল ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া।
৩. শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার ওপরে চলে যাওয়া।
৪. বমি বমি ভাব বা ক্রমাগত বমি হওয়া এবং মাংসপেশিতে তীব্র টান বা ব্যথা।
৫. বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট হওয়া এবং রোগী একপর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে পড়া।
শরীর সতেজ রাখতে বিশেষজ্ঞদের জরুরি ‘প্রেসক্রিপশন’
তীব্র গরমে শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে এবং হিট স্ট্রোক এড়াতে চিকিৎসকেরা নিচের নিয়মগুলো কঠোরভাবে মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন:
-
প্রচুর পানি ও তরল খাবার: তৃষ্ণা না পেলেও দিনে অন্তত ৩-৪ লিটার নিরাপদ পানি পান করুন। বাইরে বের হলে সবসময় পানির বোতল সাথে রাখুন। পানির পাশাপাশি ডাবের পানি, ঘরে তৈরি লেবুর শরবত বা পাতলা স্যালাইন খেতে পারেন, যা শরীরের ইলেকট্রোলাইট বা লবণের ভারসাম্য বজায় রাখে।
-
সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলুন: দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রোদের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে। খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এই সময়ে বাইরে বের হওয়া থেকে বিরত থাকুন। বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা, সানগ্লাস এবং চওড়া হ্যাট বা টুপি ব্যবহার করুন।
-
পোশাক নির্বাচনে সচেতনতা: গরমে আঁটসাঁট বা গাঢ় রঙের পোশাক শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তাই শরীর ঠাণ্ডা ও সতেজ রাখতে ঢিলেঢালা, হালকা রঙের সুতি কাপড় পরিধান করুন।
-
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: এই সময়ে অতিরিক্ত তেল-মসলাযুক্ত, ভাজা পোড়া এবং বাসি খাবার সম্পূর্ণ পরিহার করুন। সহজে হজম হয় এমন তরল ও হালকা খাবার যেমন— লাউ, ঝিঙে, পটলের মতো সবজি, টক দই এবং রসালো ফল (তরমুজ, বাঙ্গি) খাদ্যতালিকায় রাখুন।
-
চা-কফি ও কোমল পানীয়কে ‘না’ বলুন: অতিরিক্ত চা, কফি বা প্যাকেটজাত কার্বোনেটেড পানীয় শরীরকে আরও বেশি পানিশূন্য (Dehydrated) করে তোলে। তাই গরমের দিনগুলোতে এসব পানীয় যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কেউ আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিক প্রাথমিক চিকিৎসা
আপনার চোখের সামনে যদি কেউ হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, তবে অ্যাম্বুলেন্স ডাকার পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবে নিচের পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করুন:
-
আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত রোদ থেকে সরিয়ে কোনো ঠাণ্ডা, ছায়াযুক্ত বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থানে নিয়ে যান।
-
তাঁর শরীরের অতিরিক্ত জামাকাপড় খুলে বা ঢিলে করে দিন।
-
পুরো শরীর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে দিন বা ভেজা কাপড় দিয়ে বারবার মুছে ফেলুন। সম্ভব হলে ঘাড়, বগল ও কুচকিতে বরফ (Ice pack) দিন।
-
রোগী জ্ঞান না হারালে তাকে ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা পানি বা খাবার স্যালাইন পান করান। জ্ঞান হারালে মুখে কিছু দেওয়া যাবে না।
মনে রাখবেন, তীব্র গরমে অবহেলা বড় বিপদের কারণ হতে পারে। সচেতনতাই পারে এই তাপদাহের মধ্যেও আপনাকে ও আপনার পরিবারকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে।