নতুন আর্থিক কৌশলে ইরানের তেল কিনছে ভারত

ভারত সম্প্রতি ইরানি অপরিশোধিত তেল আমদানির অর্থ পরিশোধে একটি নতুন ও ব্যতিক্রমী পদ্ধতি ব্যবহার করছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতীয় রিফাইনারিগুলো এই তেলের মূল্য ‘চিরবৈরী দেশ’ চীনের মুদ্রা ইউয়ানে পরিশোধ করছে। পুরো আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়া মুম্বাইভিত্তিক আইসিআইসিআই ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হচ্ছে, যার সাংহাই শাখাও এতে যুক্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
সূত্রগুলো জানায়, দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান থেকে তেল কেনা ও তার অর্থ পরিশোধ জটিল হয়ে পড়েছিল। বিশেষ করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে সরাসরি ডলার বা প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লেনদেন করা সম্ভব হচ্ছিল না। এই পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে ইউয়ান ব্যবহার করে পেমেন্ট করার ব্যবস্থা নেয়া হয়, যা মূলত চীনের আর্থিক নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র একটি অস্থায়ী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইরান ও রাশিয়ার সমুদ্রপথে তেল বাণিজ্যের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞায় ৩০ দিনের জন্য শিথিলতা দিয়েছিল, যাতে বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা যায়। তবে মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, এই ছাড় আর নবায়ন করা হবে না এবং ইরানি তেলের ক্ষেত্রে এই সুবিধা খুব শিগগিরই শেষ হয়ে যাবে।
এই সময়ের মধ্যেই ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন প্রায় সাত বছর পর প্রথমবারের মতো ইরানি তেল আমদানি করে। একটি বড় আকারের কার্গো জাহাজের মাধ্যমে আনা প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের মূল্য আনুমানিক ২০ কোটি ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের জন্যও কয়েকটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ভারতের বন্দরে ভিড়তে দেয়া হয়, যার মধ্যে একটি জাহাজ ইতিমধ্যে তেল খালাসও সম্পন্ন করেছে।
লেনদেন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সূত্রগুলো জানায়, এসব তেলের অর্থ আইসিআইসিআই ব্যাংকের মাধ্যমে ইউয়ানে পরিশোধ করা হচ্ছে এবং ব্যাংকের সাংহাই শাখা এই অর্থ ইরানি বিক্রেতাদের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করছে। তবে বিক্রেতাদের সুনির্দিষ্ট পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে পেমেন্ট ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রমী দিকও উঠে এসেছে। সাধারণত নিষেধাজ্ঞা থাকা দেশের তেলের ক্ষেত্রে অর্থ পরিশোধ করা হয় পণ্য ডেলিভারি বা খালাসের পর। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন নাকি জাহাজ ভারতের জলসীমায় প্রবেশ করার পরেই প্রায় ৯৫ শতাংশ মূল্য পরিশোধ করেছে, যা সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে প্রচলিত নিয়মের বাইরে একটি অস্বাভাবিক ব্যবস্থা।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে ইরানি তেল কেনা থেকে বিরত ছিল, বিশেষ করে ২০১৯ সালের পর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপের কারণে। তবে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পরিবর্তন আসায় ভারত রাশিয়া থেকে বড় পরিমাণে তেল আমদানি শুরু করে এবং সেই প্রক্রিয়ায় কিছু ক্ষেত্রে চীনা মুদ্রার ব্যবহারও দেখা গেছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যদিও ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন জানিয়েছে যে তারা আপাতত নতুন করে ইরানি তেল কেনার পরিকল্পনা করছে না, তবুও সাম্প্রতিক এই লেনদেনগুলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যে নতুন ধরনের আর্থিক কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অন্যদিকে ইরানি তেলের প্রধান ক্রেতা হিসেবে ইতিমধ্যে চীনের স্বাধীন রিফাইনারগুলো বাজারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে নিয়েছে।
সব মিলিয়ে নিষেধাজ্ঞা, বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার এবং আঞ্চলিক ব্যাংকিং নেটওয়ার্ক এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ভারত-ইরান তেল বাণিজ্যে একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে, যা বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দৈএনকে/জে, আ