বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • মরিয়মের মৃত্যু: আপসনামার পরও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি নেই, কৃত্রিম সংকট হলে ব্যবস্থা: জ্বালানি মন্ত্রী আফগানিস্তান-জিম্বাবুয়েকে নিয়ে আমিরাতে ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে ৬ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৯৪৮ রামসু বাজারের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে সেনাবাহিনী: মাসব্যাপী উন্নয়ন কার্যক্রমের সমাপনী নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশেই রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে ল্যাপটপ চুরির অভিযোগ রাশেদ খাঁনের মিরপুরে সংঘর্ষের পর সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জামায়াত আমিরের জাতিসংঘে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবিক রাষ্ট্রের বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী: মাহদী আমিন মরিয়মের বাবার আপসনামা দাখিল, জামিন পেলেন মাকসুদা; কারাগারেই নজরুল
  • ইস্টার উৎসবেও গাজার খ্রিস্টানদের মুখে নেই হাসি

    ইস্টার উৎসবেও গাজার খ্রিস্টানদের মুখে নেই হাসি
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    বিশ্বজুড়ে ইস্টার উদযাপন আনন্দ ও উৎসবের প্রতীক হলেও, ফিলিস্তিনের গাজার খ্রিস্টানদের জন্য এটি শোক ও সংকটের দিন হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ, বাস্তুচ্যুতি এবং তীব্র অভাবের মধ্যে তারা উদযাপন না করে নীরব প্রার্থনার মাধ্যমে দিনটি কাটাচ্ছেন। বহু বছরের ঐতিহ্য ভেঙে এবার উৎসবের আনন্দের জায়গা নিয়েছে বেঁচে থাকার লড়াই।

    সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা বলছে, গাজায় চলমান যুদ্ধের মধ্যে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য এবারের ইস্টার এসেছে গভীর শোক আর সংকটের আবহে। আনন্দের এই ধর্মীয় উৎসব সেখানে পরিণত হয়েছে নীরব প্রার্থনা আর বেঁচে থাকার সংগ্রামের দিনে।

    বিশ্বজুড়ে খ্রিস্টানদের জন্য ইস্টার আনন্দের সময় হলেও, গাজার ক্ষুদ্র খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের জন্য এটি আরেকটি বিষণ্ন দিন হয়ে উঠেছে। বাস্তুচ্যুতি ও তীব্র সংকটের মধ্যেই রোববার তারা যিশু খ্রিস্টের পুনরুত্থান স্মরণ করে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব পালন করেন।

    গাজায় এখন এক হাজারেরও কম খ্রিস্টান বাস করেন। যুদ্ধ শুরুর আগেই এই সম্প্রদায় ছোট ছিল, আর এরপর তাদের অনেকেই ঘরবাড়ি ও গির্জায় হামলায় নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরায়েল গাজায় যে আগ্রাসন শুরু করে, তাতে এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের একটি কমিশন ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই যুদ্ধকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

    গাজার গির্জাগুলোতে প্রার্থনা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও নীরব সমাবেশের মাধ্যমে ইস্টার পালন করা হয়েছে। এমনকি এই উৎসবের দিনেও পরিবারগুলো বেঁচে থাকা ও শান্তির আশায় দিনটি কাটিয়েছে। এই সম্প্রদায়ের অনেকেই গাজা ছেড়ে চলে গেছেন, যদিও এখানে খ্রিস্টানদের বসবাসের ইতিহাস দুই হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো।

    তবে মৌলিক জিনিসের অভাব এই উৎসবকে আরও ম্লান করে দিয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি ও খাদ্যের সংকট তীব্র, এমনকি ইস্টারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ডিমও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না।

    দশকের পর দশক ধরে গাজায় কী ঢুকবে আর কী বের হবে, তা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে ইসরায়েল। এই যুদ্ধের সময় সেই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর হয়েছে। গত বছরের অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি থাকলেও ইসরায়েল গাজায় অবরোধ ও হামলা অব্যাহত রেখেছে। এখানে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস করে এবং তাদের অধিকাংশই বাস্তুচ্যুত।

    পশ্চিম গাজার আল-রান্তিসি শিশু হাসপাতালের কাছে বাড়ি থেকে বাস্তুচ্যুত ফুয়াদ আয়াদ বলেন, তিনি গাজা সিটির বিভিন্ন জায়গায় ডিম খুঁজেছেন, কিন্তু কোথাও পাননি। তিনি বলেন, ‘আমরা শিশুদের জন্য ডিম রঙ করতাম, কখনও মুসলিম শিশুরাও এসে রঙিন ডিম নিত।’

    তিনি বলেন, এবার তাদের পরিবারে ইস্টারের ঐতিহ্যবাহী যৌথ ভোজও হবে না, কারণ মাংস খুবই দুষ্প্রাপ্য ও দামি। ৩১ বছর বয়সী ফুয়াদ বলেন, আগে তিনি আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের বাড়ি যেতেন, উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতেন এবং নানা ঐতিহ্য ও রীতি-নীতি পালন করতেন।

    তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে খেতাম, ডিম রঙ করতাম। এটি ছিল আনন্দে ভরা একটি সুন্দর উৎসব। আমরা বয়স্কদের দেখতে যেতাম, তাদের জন্য প্রার্থনা করতাম, মুসলিম প্রতিবেশীদের কাছেও যেতাম’।

    তিনি যে ‘হোলি ফ্যামিলি চার্চে’ যেতেন, সেটিও এই ইসরায়েলি আগ্রাসনের মধ্যে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। ফুয়াদ বলেন, ‘এই গির্জায় আমার তিনজন আত্মীয় নিহত হয়েছেন, আরেক হামলায় ২০ জনের বেশি খ্রিস্টান মারা গেছেন’।

    এ বছর গাজায় একমাত্র ক্যাথলিক গির্জায় ইস্টারের উপস্থিতি কমে গেছে, কারণ অনেকেই গাজা ছেড়ে চলে গেছেন। ফুয়াদ বলেন, ‘আমরা সংখ্যালঘু হলেও আমাদের গির্জায় প্রার্থনা চালিয়ে যাব’। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা শুধু প্রার্থনা করেছি, উদযাপন করিনি— আমাদের শহিদদের কারণে। আমরা খ্রিস্টানরা এই ভূমিরই অংশ এবং গাজার সবার মতোই আমরা কষ্ট ভোগ করছি।’

    তিনি বলেন, ‘রাজনীতি বা ধর্ম যাই হোক না কেন, আমরা সবাই ফিলিস্তিনি এবং আমরা সবাই এই দখলদার বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু’।

    ইসরায়েলের বিধিনিষেধের কারণে গত দুই বছর ধরে গাজার খ্রিস্টানরা পূর্ব জেরুজালেমের ওল্ড সিটিতে গিয়ে ‘চার্চ অব দ্য হোলি সেপালকার’-এ প্রার্থনায় অংশ নিতে পারেননি।

    গত সপ্তাহে জেরুজালেমের ল্যাটিন প্যাট্রিয়ার্ক কার্ডিনাল পিয়েরবাত্তিস্তা পিজ্জাবাল্লাকে ওই গির্জায় ঢুকতে বাধা দেয় ইসরায়েলি পুলিশ। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পরে সিদ্ধান্তটি প্রত্যাহার করা হয়। একইভাবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর ইসলাম ধর্মের তৃতীয় পবিত্র স্থান আল-আকসা মসজিদও মুসল্লিদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

    গাজার তাল আল-হাওয়া এলাকার এলিয়াস আল-জেলদা বলেন, তার বাড়ি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে তাকে সেখান থেকে পালাতে হয়েছে। ৬০ বছর বয়সী এলিয়াস বলেন, ‘আমি গণহত্যার সময় হোলি ফ্যামিলি চার্চে আশ্রয় নিয়েছিলাম। যুদ্ধবিরতির পর সাবরা এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নিয়েছি।’

    তিনি বলেন, ‘অনেক খ্রিস্টানের মতো আমিও দক্ষিণ গাজায় যাইনি, ঝুঁকি নিয়েই গির্জায় থেকেছি। কেউ সেন্ট পোরফিরিয়াস চার্চে ছিলেন, তবে বেশিরভাগই হোলি ফ্যামিলি চার্চে ছিলেন।’

    অর্থডক্স চার্চ কাউন্সিলের সদস্য এলিয়াস জানান, গির্জাটিও একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি বন্ধু, প্রতিবেশী ও আত্মীয় হারিয়েছি— অনেকে তাদের ঘর ও বিশ্বাসের কাছাকাছি থাকতে গিয়ে নিহত হয়েছেন।’

    তার কাছে ইস্টার ছিল আনন্দ ও উৎসবের সময়। তিনি বলেন, ‘সব পরিবারই তাদের বাড়িতে আনন্দ উদযাপন করত, আত্মীয়দের বাড়ি যেত, বন্ধুদের স্বাগত জানাত। গির্জা ও বাড়িতে রঙিন ডিম, কাহক, মামুল আর ঈদিয়ার মতো উপহার বিনিময়ের ঐতিহ্য ছিল’। তিনি বলেন, ‘কিছু পরিবার পশ্চিম তীরেও যেত, কারণ সেখানে বড় উৎসব হতো।’

    তবে এবারের উদযাপন সীমিত। এলিয়াস বলেন, ‘ঐতিহ্যের অনেক কিছুই নেই। পুরো গাজায় কোথাও ডিম নেই। শিশুদের জন্য কোনও বিনোদন নেই— না পার্ক, না খেলার মাঠ, না বাগান, না সাশ্রয়ী রেস্তোরাঁ’। তিনি বিদ্যুৎ সংকটের কথাও তুলে ধরেন। তার ভাষায়, ‘বিদ্যুৎ এখনও বড় সমস্যা। ডিজেল ও জেনারেটরের তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে’।

    ৭৪ বছর বয়সী আমাল আল-মাসরি জানান, তিনি রেমাল এলাকায় থাকতেন। এটি প্রথম দিকেই ইসরায়েলি বোমা হামলার শিকার হয়। তিনি স্বামীসহ আরও দক্ষিণের দিকে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন এবং তিনবার বাস্তুচ্যুত হন। তিনি বলেন, ‘দুই বছর ধরে দক্ষিণে কোনও উৎসবই ছিল না। এমনকি বড়দিনেও কোনও উদযাপন হয়নি। আমাদের চেয়ারে বসার সুযোগও ছিল না, মাটিতে বসে প্রার্থনা করতে হয়েছে।’

    তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, আগে উৎসবে পরিবারগুলো একে অপরকে দাওয়াত দিত, একসঙ্গে খেত, মিষ্টি বিনিময় করত এবং আনন্দ করত। আমরা পুরো দিন একসঙ্গে কাটাতাম— খাওয়া-দাওয়া, কথা বলা আর উদযাপনে।

    এ বছর আমাল ও তার সম্প্রদায় ইস্টারের মৌলিক কিছু ধর্মীয় আচার পালনের চেষ্টা করছেন। তবে শিশুদের আনন্দের বড় অংশ রঙিন ডিম এখনও নেই। তিনি বলেন, ‘আমি সর্বত্র ডিম খুঁজেছি, কিন্তু পুরো গাজায় কোথাও পাইনি।’


    দৈএনকে/জে, আ
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন