নেপালের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে বালেন্দ্র শাহ

নেপালে সাধারণ নির্বাচনের ভোট গণনা এখনো চললেও র্যাপার থেকে রাজনীতিতে আসা বালেন্দ্র শাহ শুরুতেই উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। ফলে দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে শাহ—যিনি জানুয়ারি পর্যন্ত নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুর মেয়র ছিলেন—প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন বেশ কয়েকজন শক্তিশালী প্রার্থীর সঙ্গে। তাদের মধ্যে ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল)-এর সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং নেপালি কংগ্রেসের গগন থাপা।
শনিবার সকাল পর্যন্ত গণনা হওয়া ভোটে দেখা যাচ্ছে, শাহের মধ্যপন্থী রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) সরাসরি নির্বাচিত ১৬৫টি আসনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জায়গায় এগিয়ে আছে বলে জানিয়েছে বিবিসি নেপালি।
অন্যদিকে নেপালি কংগ্রেস দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে এবং ইউএমএল তৃতীয় স্থানে রয়েছে।
চূড়ান্ত ফলাফল আগামী সপ্তাহের আগেই নাও আসতে পারে। পাহাড়ি দেশ নেপালে ভোট গণনা ঐতিহ্যগতভাবেই ধীরগতির। দূরবর্তী অঞ্চলগুলো থেকে ব্যালট বাক্স আনতে অনেক সময় হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়। ফলে পুরো ফলাফল জানতে কয়েক দিন লেগে যেতে পারে।
২০২২ সালের সর্বশেষ নির্বাচনের ক্ষেত্রেও চূড়ান্ত ফল প্রকাশ হতে দুই সপ্তাহের বেশি সময় লেগেছিল।
বালেন্দ্র শাহ কে?
৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ—যিনি স্থানীয়ভাবে “বালেন” নামে বেশি পরিচিত—পেশায় একজন অবকাঠামো প্রকৌশলী। তবে রাজনীতিতে আসার আগে তিনি নেপালের হিপ-হপ অঙ্গন ‘নেফহপ’-এর একজন পরিচিত র্যাপশিল্পী ছিলেন।
তিনি বেশ কয়েকটি গান প্রকাশ করেছেন, যার অনেকগুলোই সামাজিক বার্তাধর্মী। এর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় গান “বালিদান”, যার অর্থ ‘ত্যাগ’। গানটি ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ পেয়েছে।
গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষেধাজ্ঞা নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ, যা পরে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে বড় আন্দোলনে রূপ নেয়, সেই সময় তরুণদের মধ্যে শাহের জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে।
সেই বিক্ষোভে ৭৭ জন নিহত হন, যাদের মধ্যে অনেকেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। ওই পরিস্থিতিতে তৎকালীন নেতা কেপি শর্মা ওলিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়। যদিও ৭৪ বছর বয়সী ওলি এবারও নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং জয়ের বিষয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন।
বালেন্দ্র শাহ প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানিয়েছিলেন এবং এক পর্যায়ে কেপি ওলিকে “সন্ত্রাসী” আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
তবে এমন মন্তব্যের কারণে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলেছেন, দেশ পরিচালনার জন্য তিনি কতটা উপযুক্ত।
কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে রাজধানীর সড়ক পরিষ্কার রাখা এবং অবৈধ ব্যবসা দমনে তিনি কঠোর অভিযান চালান। এ সময় রাস্তার হকার ও ভূমিহীন মানুষের বিরুদ্ধে পুলিশের কড়া পদক্ষেপ নেওয়ায় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখেও পড়েন।
এসব বিষয়ে বালেন্দ্র শাহের প্রচারণা টিমের সদস্যরা বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
এই নির্বাচনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেপি ওলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ঝাপা-৫ আসনে। এখন পর্যন্ত ভোট গণনায় দেখা যাচ্ছে, শাহ উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন।
তবে প্রচারণার সময় তিনি গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেওয়া এড়িয়ে গেছেন। এমনকি নির্বাচনের দিনও সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। কালো সানগ্লাস পরে সাংবাদিকদের ভিড় এড়িয়ে দ্রুত চলে যাওয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমে আলোচিত হয়।
নেপালের কিছু গণমাধ্যম আশঙ্কা করছে, তিনি ক্ষমতায় গেলে এই দূরত্ব বজায় থাকতে পারে।
তবু অনেক তরুণ ভোটার বলছেন, দেশের জন্য এখন নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন এবং শাহ সেই পরিবর্তনের প্রতীক।
নেপালিরা কীসের জন্য ভোট দিয়েছেন?
বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে শুধু দেশের পরবর্তী নেতৃত্বই নয়, একই সঙ্গে ২৭৫ সদস্যের সংসদও নির্বাচন করা হয়েছে।
নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থা দুটি পদ্ধতির সমন্বয়ে পরিচালিত হয়—ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব। প্রতিটি ভোটার দুটি করে ভোট দিয়েছেন।
এর মধ্যে ১৬৫ জন সংসদ সদস্য সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন, যেখানে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী আসনটি জয় করেন। বাকি ১১০ জন নির্বাচিত হন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল জাতীয়ভাবে মোট কত শতাংশ ভোট পেয়েছে তার ভিত্তিতে।
মোট প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ মানুষ এই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্য ছিলেন। নির্বাচন শেষে কর্মকর্তারা জানান, ভোটের হার প্রায় ৬০ শতাংশ হতে পারে।
এই নির্বাচন কেন গুরুত্বপূর্ণ?
গত বছরের আন্দোলনের পর নেপালের এই নির্বাচনকে অনেকেই “পুরনো বনাম নতুন নেতৃত্বের লড়াই” হিসেবে দেখছেন।
বর্তমানে এগিয়ে থাকা রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ২০২২ সালের নির্বাচনে চতুর্থ স্থানে ছিল।
এই নির্বাচনে তরুণ ভোটাররাই বড় ভূমিকা রেখেছেন। প্রায় আট লাখ ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দিয়েছেন। তাদের আকৃষ্ট করতে রাজনৈতিক দলগুলো চাকরির সুযোগ সৃষ্টি, দুর্নীতি দমন এবং সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে নেপাল বারবার জোট সরকার পরিবর্তনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে। সাধারণত তিনটি বড় রাজনৈতিক দল—যার মধ্যে দুটি কমিউনিস্ট দল—এই সরকারগুলোতে নেতৃত্ব দিয়েছে।
কিন্তু এবার বড় ধরনের কোনো জাতীয় জোট গঠন হয়নি। ফলে ভোটারদের কাছে দল ও প্রার্থীদের অবস্থান আরও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
এছাড়া এই নির্বাচনে নতুন দল এবং নতুন মুখের উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্য। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ প্রার্থী স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
এসবই ইঙ্গিত দেয়, বহু নেপালি এখন নতুন ধারণা ও নতুন নেতৃত্বের সন্ধান করছেন।
যদি বালেন্দ্র শাহ শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হন, তবে তা নেপালের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। দশকের পর দশক ধরে পুরনো নেতৃত্ব ও অস্থিতিশীল জোট সরকারের পর এটি হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাজনৈতিক অধ্যায়।
সূত্র: বিবিসি বাংলা