ইরানকে ঘিরে যুদ্ধের বিস্তার, অস্থির মধ্যপ্রাচ্য

কয়েক সপ্তাহের উত্তেজনা ও হুমকির পর অবশেষে ইরানকে কেন্দ্র করে সরাসরি সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন, ইরানে “বড় ধরনের যুদ্ধের অভিযান” শুরু হয়েছে। একই দিনে তেহরানসহ একাধিক শহরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় ইসরায়েল। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরান।
ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য “নরকের দরজা” একের পর এক খুলে যাবে এবং হামলা আরও তীব্র হবে। তেহরান স্পষ্ট করে বলেছে, এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সব স্বার্থ এখন তাদের জন্য বৈধ লক্ষ্যবস্তু। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে— তারা যদি এ সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তবে সেটিকে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবে দেখা হবে।
সংঘাতের চার দিনে ইরানে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৮৭ জনে দাঁড়িয়েছে বলে দেশটির রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। যদিও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। যুদ্ধের মধ্যেই ইরানের ফার্স প্রদেশে ৪.৩ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
ইরানের পাল্টা হামলায় কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে মার্কিন স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। কুয়েত দাবি করেছে, তারা কয়েক দিনে ১৭৮টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৩৮০টিরও বেশি ড্রোন প্রতিহত করেছে, যদিও কিছু আঘাতে তাদের সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে সীমিত ক্ষয়ক্ষতির কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দোহা, আবুধাবি ও বৈরুতেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপের পর ইসরায়েল লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, সরকারি বাহিনী ছাড়া অন্য কোনো গোষ্ঠীর সামরিক তৎপরতা নিষিদ্ধ। একই সময়ে ইসরায়েলের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলে একাধিক দফায় ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করেছে ইরান; সতর্কতামূলক সাইরেন বেজে উঠেছে বিভিন্ন এলাকায়।
সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও। ইরান গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে এবং সেখানে জাহাজ চলাচলের চেষ্টা করলে জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে চীনে তেল পরিবহনের জন্য সুপারট্যাঙ্কার ভাড়া সর্বকালের সর্বোচ্চ ৪ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। কাতারে ড্রোন হামলার পর তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন বন্ধ হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে কুয়েত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাস ভিসা কার্যক্রম স্থগিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক দেশ থেকে নিজ নাগরিকদের দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। একই সময়ে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুদ্ধ বন্ধে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে— সংঘাত কি সীমিত পাল্টাপাল্টি হামলায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেবে? হরমুজ প্রণালী, উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামো এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা এখন কেবল আঞ্চলিক সংকট নয়; এটি ক্রমেই বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে।