দাজ্জালের আগমন ঘনিয়ে আসছে: ইসলামী হাদিসের সতর্কবার্তা

মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ংকর ফিতনা বা বিপর্যয়ের নাম 'দাজ্জাল'। ইসলামি আকিদা ও হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, কিয়ামতের পূর্বে এই একচক্ষু বিশিষ্ট ভণ্ড মসিহ্র আগমন ঘটবে, যা হবে মুমিনদের জন্য চূড়ান্ত ঈমানি পরীক্ষা। সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক অস্থিরতা এবং ধর্মীয় জ্ঞানের স্বল্পতা দেখে ইসলামি চিন্তাবিদরা সতর্ক করছেন—দাজ্জালের আগমনের অধিকাংশ আলামত বা লক্ষণ এখন আমাদের চারপাশেই স্পষ্ট।
দাজ্জাল কে? হাদিসের আলোকে তার পরিচয়
সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, নবী মুহাম্মদ ﷺ বলেছেন, "আদম (আ.) থেকে কিয়ামত পর্যন্ত দাজ্জালের চেয়ে বড় ফিতনা আর আসেনি।" দাজ্জাল কোনো রূপক চরিত্র নয়, বরং এক রক্ত-মাংসের মানুষ আকৃতির দানবীয় সত্তা। তার প্রধান পরিচয়:
- এক চক্ষু অন্ধ: তার এক চোখ হবে আঙুরের মতো ফোলা ও বিকৃত।
- কপালে ‘কাফির’ লেখা: তার কপালে স্পষ্টাক্ষরে ‘কাফির’ (ك ف ر) লেখা থাকবে, যা কেবল প্রকৃত মুমিনরাই পড়তে পারবে।
- মিথ্যা ক্ষমতা: সে আকাশ থেকে বৃষ্টি নামাবে, মৃতকে জীবিত করার অভিনয় করবে এবং খাদ্যের ভাণ্ডার প্রদর্শন করে নিজেকে ঈশ্বর দাবি করবে।
- মিথ্যা জান্নাত ও জাহান্নাম: তার সাথে থাকবে এক বিভ্রান্তিকর জান্নাত ও জাহান্নাম। প্রকৃতপক্ষে তার জান্নাত হবে জাহান্নাম আর জাহান্নাম হবে জান্নাত।
ভিন্ন ধর্মে দাজ্জালের ইঙ্গিত
কেবল ইসলাম ধর্মেই নয়, অন্যান্য প্রধান ধর্মেও এই ভণ্ড প্রতাপশালীর ইঙ্গিত পাওয়া যায়:
- খ্রিস্টধর্ম: একে বলা হয় 'Antichrist' বা খ্রিস্টশত্রু।
- ইহুদি ধর্ম: তারা একে 'False Messiah' বা ভণ্ড মুক্তিদাতা হিসেবে চেনে।
- হিন্দু ধর্ম: কল্কি অবতারের আগমনের পূর্বে কলিযুগে যে অধর্ম ও মিথ্যার জয়জয়কার হবে, তার সাথে দাজ্জালের সময়ের মিল খুঁজে পান অনেক গবেষক।
আগমনের লক্ষণ: আমাদের বর্তমান সমাজ কি সেই পথে?
হাদিস শাস্ত্রে দাজ্জাল আসার আগে যেসব সামাজিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোই বর্তমান সমাজে দৃশ্যমান:
১. দ্বীনি জ্ঞানের অভাব ও সত্যনিষ্ঠ আলেমদের প্রস্থান।
২. সুদ, ব্যভিচার ও জুলুমের ব্যাপক বিস্তার।
৩. সময় দ্রুত চলে যাওয়ার অনুভূতি এবং আকস্মিক মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি।
৪. হারামকে হালাল মনে করা এবং মানুষের মধ্যে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা লোপ পাওয়া।
৫. দীর্ঘস্থায়ী খরা ও বিশ্বজুড়ে চরম খাদ্যাভাব।
বর্তমানে দাজ্জাল কোথায়?
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত তামীম দারী (রা.)-এর দীর্ঘ হাদিস থেকে জানা যায়, দাজ্জাল বর্তমানে কোনো এক নির্জন স্থানে শিকলবন্দি অবস্থায় আল্লাহর হুকুমে বন্দী রয়েছে। হাদিসের ইঙ্গিত অনুযায়ী, তার উত্থান ঘটবে পূর্ব দিক থেকে। সে ঝড়ের গতিতে পুরো বিশ্ব ভ্রমণ করলেও মক্কা ও মদিনা শহরে প্রবেশ করতে পারবে না; ফেরেশতারা তা পাহারা দেবেন।
মুক্তির উপায় ও আমাদের করণীয়
দাজ্জালের জাদুকরী ক্ষমতা ও ফিতনা থেকে বাঁচতে নবী ﷺ কিছু বিশেষ আমলের নির্দেশ দিয়েছেন:
- সূরা কাহফ: প্রতি জুমুয়াবারে নিয়মিত সূরা কাহফ পাঠ করা, বিশেষ করে প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ রাখা।
- দোয়া মাসুরা: নামাজের শেষ বৈঠকে দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তির জন্য বিশেষ দোয়া পাঠ করা।
- ঈমানি দৃঢ়তা: আমল ও ইলম অর্জনের মাধ্যমে নিজের অন্তরকে আলোকিত রাখা, যাতে দাজ্জালের মিথ্যা অলৌকিকতা ঈমান হরণ করতে না পারে।
আলেমরা বলছেন, দাজ্জাল কবে আসবে তার সঠিক তারিখ কেউ জানে না। তবে তার আসার সব পথ যেন আজ উন্মুক্ত। নিজেকে প্রশ্ন করার সময় এখনই—আমরা কি সেই ভয়াবহ পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত?
দৈএনকে/জে, আ