বাড়ছে আগাম বয়ঃসন্ধি, শিশুস্বাস্থ্যে নতুন চ্যালেঞ্জ

দশ বছর বয়সের কোটা পেরোনোর আগেই পিরিয়ড বা বয়ঃসন্ধির লক্ষণ দেখা দিচ্ছে কন্যাসন্তানদের মধ্যে। এক সময় যা পঞ্চম থেকে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া ছাত্রীদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ছিল, তা এখন অনেক আগেভাগেই শুরু হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘প্রিকশাস পিউবার্টি’ বা সময়ের আগে বয়ঃসন্ধি। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের চারপাশে এই প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অভিভাবকদের জন্য এক বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
খাদ্যাভ্যাস যখন কাল: ব্রয়লার ও ফাস্টফুডের প্রভাব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অকাল পরিবর্তনের পেছনে প্রধান কারণ হলো ত্রুটিপূর্ণ জীবনযাত্রা ও খাদ্যাভ্যাস। আজকের প্রজন্মের শিশুদের ফুড হ্যাবিট অ্যানালাইসিস করলে দেখা যায়, তারা দেশি মাছ, মাংস বা শাকসবজির তুলনায় ব্রয়লার মুরগি ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি বেশি আসক্ত। অনলাইন ফুড ডেলিভারি অ্যাপের সহজলভ্যতায় চিকেন ফ্রাই, বার্গার, নাগেটস কিংবা সসেজ এখন তাদের নিত্যদিনের খাবার।
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে উৎপাদিত ব্রয়লার মুরগিকে দ্রুত বড় করতে ব্যবহৃত বিভিন্ন হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে ‘এস্ট্রোজেন’ হরমোনকে নকল (Mimic) করে। এছাড়া অতিরিক্ত ফাস্টফুড ও পোল্ট্রি ইনটেকের ফলে শিশুরা ওমেগা-৩ ও ওমেগা-৬ টক্সিসিটিতে ভুগছে। ফলে বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত ওজন (Obesity) এবং অকাল শারীরিক গঠন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ও মানসিক চাপ
খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি জীবনযাত্রার আরও কিছু কারণ এই সংকটকে ঘনীভূত করছে:
- বিরামহীন পড়াশোনা ও স্ট্রেস: আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখনকার শিশুরা পড়াশোনা নিয়ে অনেক বেশি মানসিক চাপে থাকে।
- রোদের অভাব ও ডিজিটাল আসক্তি: বাইরে খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ায় শিশুরা দিনের বড় একটা সময় মোবাইল স্ক্রিনে কাটায়। এতে শরীরে ভিটামিন ডি-র অভাব প্রকট হচ্ছে এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
- কেমিক্যাল এক্সপোজার: প্লাস্টিক ও প্রসাধন সামগ্রীসহ চারপাশের রাসায়নিক উপাদানের প্রভাবও শিশুদের লিড করছে লেপটিন রেজিস্ট্যান্সের দিকে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে শিশুদের সামগ্রিক জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনার তাগিদ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। কমার্শিয়াল চিকেনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে খাদ্যতালিকায় আনতে হবে বৈচিত্র্য।
প্রয়োজনীয় পরিবর্তনসমূহ:
- ব্রয়লার মুরগির বদলে দেশি মুরগি, মাছ ও ডিমের অভ্যাস করা।
- প্রচুর পরিমাণে তাজা ফলমূল ও রঙিন শাকসবজি গ্রহণ।
- বাদাম, গরুর কলিজা ও মগজের মতো পুষ্টিকর খাবার যোগ করা।
- স্ক্রিন টাইম কমিয়ে সূর্যের আলোয় খেলাধুলা নিশ্চিত করা।
- প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চমাত্রার ভিটামিন ডি গ্রহণ।
আগাম বয়ঃসন্ধি একটি জটিল বিষয়, যার পেছনে একাধিক জৈবিক ও পরিবেশগত কারণ জড়িত। তাই সচেতনতা ও সঠিক জীবনযাপনই হতে পারে এর মোকাবিলার প্রথম ধাপ।
দৈএনকে/জে, আ