সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
Natun Kagoj

নবীজির হাদিসে জীবনের মূল লক্ষ্য ও মৃত্যুর গুরুত্ব

নবীজির হাদিসে জীবনের মূল লক্ষ্য ও মৃত্যুর গুরুত্ব
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

মৃত্যু মানুষের জীবনের শেষ অধ্যায়। এই দুনিয়া স্থায়ী নয়; বরং একটি পরীক্ষার মঞ্চ। মানুষের আচার-আচরণ ও জীবনযাপনই নির্ধারণ করে তার মৃত্যুর পর প্রভাব ও পরিণতি।

ইসলামের শিক্ষা হলো, এমন জীবন গড়া যাতে মৃত্যু তার জন্য স্বস্তি ও মুক্তির বার্তা হয়ে আসে এবং তার উপস্থিতি জীবিত অবস্থায় অন্যদের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার কারণ হয়। এ বাস্তবতাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী ভাষায় তুলে ধরেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস।
عَنْ أَبِي قَتَادَةَ بْنِ رِبْعِيٍّ الأَنْصَارِيِّ أَنَّهُ كَانَ يُحَدِّثُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم مُرَّ عَلَيْهِ بِجِنَازَةٍ فَقَالَ مُسْتَرِيحٌ وَمُسْتَرَاحٌ مِنْهُ قَالُوا يَا رَسُولَ اللهِ مَا الْمُسْتَرِيحُ وَالْمُسْتَرَاحُ مِنْهُ قَالَ الْعَبْدُ الْمُؤْمِنُ يَسْتَرِيحُ مِنْ نَصَبِ الدُّنْيَا وَأَذَاهَا إِلَى رَحْمَةِ اللهِ وَالْعَبْدُ الْفَاجِرُ يَسْتَرِيحُ مِنْهُ الْعِبَادُ وَالْبِلاَدُ وَالشَّجَرُ وَالدَّوَابُّ

ক্বাতাদাহ ইবনু রিবঈ আনসারী (রা.) বর্ণনা করেন। একবার রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পাশ দিয়ে একটি জানাযা নিয়ে যাওয়া হলো।

তিনি বললেন, সে সুখী অথবা (অন্য লোকেরা) তার থেকে শান্তি লাভকারী। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল! ’মুস্তারিহ’ ও ’মুস্তারাহ মিনহু’-এর অর্থ কী? তিনি বললেনঃ মু’মিন বান্দা দুনিয়ার কষ্ট ও যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়ে আল্লাহর রহমতের দিকে পৌঁছে শান্তি প্রাপ্ত হয়। আর গুনাহগার বান্দার আচার-আচরণ থেকে সকল মানুষ, শহর-বন্দর, বৃক্ষলতা ও জীবজন্তু শান্তিপ্রাপ্ত হয়। (বুখারি, হাদিস : ৬৫১২)
এই হাদিসটিতে দেখা যাচ্ছে যে,  রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে দিয়ে একটি জানাযা অতিক্রম করলে তিনি বলেন, “সে সুখী হয়েছে অথবা মানুষ তার থেকে শান্তি পেয়েছে।

” সাহাবিরা এর ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি দুটি অবস্থার কথা স্পষ্ট করেন।
প্রথম অবস্থা হলো, একজন মু’মিন বান্দার মৃত্যু। দুনিয়া মূলত কষ্ট, দুঃখ, দায়িত্ব, পরীক্ষা ও নানা দুশ্চিন্তায় পূর্ণ। একজন ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এসব কষ্ট সহ্য করে জীবন কাটায়। তার মৃত্যু মানে এই পরীক্ষাময় জীবন থেকে মুক্তি পাওয়া এবং আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও শান্তির দিকে যাত্রা করা।

তাই তার জন্য মৃত্যু ভয় বা ক্ষতি নয়; বরং তা এক ধরনের আরাম, বিশ্রাম ও পরম প্রশান্তির দরজা।

দ্বিতীয় অবস্থা হলো এমন ব্যক্তির, যার জীবন অন্যদের জন্য কষ্টের কারণ ছিল। সে অন্যায়, জুলুম, পাপাচার, অশান্তি বা ক্ষতিকর আচরণের মাধ্যমে মানুষ ও পরিবেশকে বিপর্যস্ত করত। তার মৃত্যুতে শুধু মানুষই নয়, শহর-বন্দর, বৃক্ষলতা এবং জীবজন্তুও যেন স্বস্তি পায়। অর্থাৎ তার অস্তিত্বই ছিল অকল্যাণের উৎস, আর তার অনুপস্থিতি সমাজের জন্য স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই হাদিস মানুষের জীবনের একটি গভীর সত্য তুলে ধরে। একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার সম্পদ, ক্ষমতা বা খ্যাতিতে নয়; বরং তার জীবন অন্যদের জন্য কতটা কল্যাণ ও শান্তির উৎস ছিল, তার ওপর নির্ভর করে। একজন সত্যিকারের মু’মিন চেষ্টা করে এমন জীবন যাপন করতে, যাতে তার উপস্থিতিতে মানুষ নিরাপদ বোধ করে এবং তার মৃত্যুতে মানুষ দোয়া করে, স্বস্তি নয়।

এই শিক্ষা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনার প্রশ্ন তুলে ধরে: আমরা কি এমন মানুষ, যার জীবন অন্যদের জন্য রহমত, নাকি এমন, যার কারণে মানুষ কষ্ট পায়? ইসলামের দৃষ্টিতে সফল সেই ব্যক্তি, যার জীবনও শান্তির উৎস এবং যার মৃত্যুও হয় প্রশান্তির সূচনা।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন