কাতারের ব্যাংকে তেলের অর্থ: ট্রাম্পের কৌশল ও উদ্দেশ্য

ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি দেশে না পাঠিয়ে কাতারের ব্যাংকে রাখা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, পাওনাদারদের হাত থেকে অর্থ রক্ষা এবং ভেনেজুয়েলার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতেই হোয়াইট হাউস এই ‘অফশোর’ ব্যাংকিং পদ্ধতি বেছে নিয়েছে।
কেন কাতারের ব্যাংক?
দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা ভেনেজুয়েলা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন। সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার তেলের অর্থ যেন পশ্চিমা কোনো পাওনাদার বা আইনি জটিলতায় আটকে না যায়, তা নিশ্চিত করতেই কাতারকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
ইতিমধ্যেই ট্রাম্প প্রশাসন প্রায় ৫০ কোটি ডলারের তেল বিক্রি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার থেকেই এই অর্থ ভেনেজুয়েলায় পৌঁছানো শুরু হয়েছে। দেশটির স্থানীয় ব্যাংকগুলোও নগদ অর্থের জোগান নিয়ে বিজ্ঞাপন দিতে শুরু করেছে।
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ ও আইনি সুরক্ষা
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশেষ নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যার ফলে ভেনেজুয়েলার এই অর্থের ওপর কোনো পক্ষ আইনি দাবি বা ‘লিয়েন’ আরোপ করতে পারবে না। ট্রাম্পের দাবি, ভেনেজুয়েলার তেল আয়ের ওপর যাদের দাবি আছে, তারা যেন এই অর্থের নাগাল না পায় এবং এই অর্থ যেন সরাসরি দেশটির মানবিক কাজে ব্যয় হয়।
তবে কাতারকে বেছে নেওয়ার পেছনে ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে মধ্যস্থতায় কাতার দীর্ঘকাল ধরে ভূমিকা রাখছে। এমনকি বাইডেন প্রশাসনের সময়ও ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে একই প্রক্রিয়ায় কাতারের মাধ্যমে লেনদেন সম্পন্ন হয়েছিল।
স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ও সমালোচকদের উদ্বেগ
এই প্রক্রিয়া নিয়ে ওয়াশিংটনে বইছে সমালোচনার ঝড়। ডেমোক্রেটিক সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন একে ‘আইনবহির্ভূত’ এবং ‘দুর্নীতিকে উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপ’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। সমালোচকদের মতে:
স্বচ্ছতার অভাব: অর্থ কাতারে রাখা হলে যুক্তরাষ্ট্রের আইনি নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে, যা এই তহবিলকে একটি ‘গোপন তহবিলে’ (Slush Fund) পরিণত করতে পারে।
ভুল হাতে অর্থ যাওয়ার ভয়: আশঙ্কা করা হচ্ছে, ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ এই অর্থ ব্যবহার করে দুর্নীতিগ্রস্ত সামরিক গোষ্ঠী বা ড্রাগ কার্টেলগুলোকে তুষ্ট করতে পারেন।
ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরতা কেন?
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদনকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও কেন ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর এত আগ্রহী, তার পেছনে রয়েছে কারিগরি কারণ।
১. ভারী তেলের প্রয়োজন: যুক্তরাষ্ট্রে যে তেল উৎপাদিত হয় তা মূলত ‘হালকা অপরিশোধিত’ তেল। কিন্তু টেক্সাস ও লুইজিয়ানার তেল পরিশোধনাগারগুলো (Refineries) ‘ভারী ও ঘন’ তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য তৈরি।
২. ব্যয়বহুল পরিবর্তন: এই পরিশোধনাগারগুলোকে হালকা তেলের উপযোগী করতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন, যা এই মুহূর্তে অসম্ভব।
৩. ভৌগোলিক সুবিধা: কানাডা ও রাশিয়ার পাশাপাশি ভেনেজুয়েলাতেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভারী তেলের মজুত রয়েছে। ফলে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ভেনেজুয়েলার ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।
ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির এই প্রক্রিয়া কেবল শুরু। ভবিষ্যতে আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ এই চ্যানেলের মাধ্যমে লেনদেন হবে, যা লাতিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব আরও জোরালো করবে।
দৈএনকে/জে, আ