সংঘাতের পথে কি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র?

ইরানজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও সহিংস সংঘর্ষ ভয়াবহ রূপ নেওয়ায় দেশটির প্রতি আবারও কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, “ইরান এখন বড় বিপদের মধ্যে রয়েছে। দেশটির বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক হামলার নির্দেশ দিতে প্রস্তুত।”
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, ইরানে চলমান আন্দোলনে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সহিংস দমন-পীড়ন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই বক্তব্য মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে এমন এক সময়ে যখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আগেই চরম বৈরিতায় রয়েছে।
এদিকে ইরান সরকার এখনও যুক্তরাষ্ট্রের এই হুমকির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে দেশটির ভেতরে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক মহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন,
ইরান বড় সমস্যায় আছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে, জনগণ এমন কিছু শহরের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে, যা কয়েক সপ্তাহ আগেও কেউ কল্পনা করেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে।
গত জুনে ইরানে বোমা হামলার নির্দেশ দেওয়া ট্রাম্প আরও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন,
তোমরা গুলি চালানো শুরু করলে আমরাও গুলি চালাবো।
তিনি আরও যোগ করেন, আমি শুধু আশা করি, ইরানের বিক্ষোভকারীরা নিরাপদ থাকবে, কারণ এই মুহূর্তে জায়গাটা খুবই বিপজ্জনক।
অধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই সপ্তাহের বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত বহু মানুষ নিহত হয়েছেন। এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের দৃশ্য সম্প্রচার করা হয়েছে। আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, রাতভর সংঘর্ষে কয়েকজন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন।
এর আগে শুক্রবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি চলমান বিক্ষোভকে ‘সন্ত্রাসী তৎপরতা’ আখ্যা দিয়ে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিদেশি শত্রু—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র—এই বিক্ষোভ উসকে দিচ্ছে।
খামেনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তারা জনসম্পদে হামলা চালাচ্ছে এবং বিদেশিদের ভাড়াটে হিসেবে কাজ করছে। তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করে বলেন, তার হাত ইরানিদের রক্তে রঞ্জিত।
বিদেশভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, গত ২৮ ডিসেম্বর বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে অন্তত ৬২ জন নিহত হয়েছেন। এদের মধ্যে ১৪ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং ৪৮ জন বিক্ষোভকারী।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে সরকারের প্রতি প্রকৃত অভিযোগ শোনার কথা বললেও, সরকারের অন্য মহলগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে—বিদেশি শক্তির সমর্থন পাওয়া এসব আন্দোলনের বিরুদ্ধে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানিয়েছেন, তেহরানের বহু নাগরিক পুলিশ থেকে বার্তা পেয়েছেন—যেসব এলাকায় সহিংসতা হচ্ছে, সেসব স্থান এড়িয়ে চলতে।
তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে, দাঙ্গাকারীদের বিরুদ্ধে সরকার খুব কঠোর ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।
এদিকে ইরানের কুর্দি ও বালুচ অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতেও উত্তেজনা ছড়িয়েছে। ইরানি মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানিয়েছে, শুক্রবার নামাজের পর বেলুচ-অধ্যুষিত জাহেদানে বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালানো হলে বেশ কয়েকজন আহত হন।