ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে বিশ্বজুড়ে তোলপাড়

ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় বিশ্ব রাজনীতিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শনিবার ভোরে ভেনেজুয়েলায় চালানো এক বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পর মাদুরো ও তার স্ত্রীকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী। নিউইয়র্কে তাদের বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্ট মামলার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ কয়েকটি দেশ সমর্থন জানালেও লাতিন আমেরিকা, এশিয়া ও ইউরোপের অনেক রাষ্ট্র একে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন বলে নিন্দা করেছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার প্রাথমিকভাবে সরাসরি নিন্দা না জানালেও পরে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, যুক্তরাজ্য মাদুরোকে বৈধ প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং তার শাসনের অবসানে ‘কোনো অনুতাপ নেই’। তবে তিনি শান্তিপূর্ণ ও বৈধ ক্ষমতা হস্তান্তরের ওপর জোর দেন।
চীন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, একটি সার্বভৌম দেশের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগে তারা ‘হতবাক ও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন’। রাশিয়া এই পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সশস্ত্র আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। ইরান বলেছে, এটি ভেনেজুয়েলার জাতীয় সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
লাতিন আমেরিকার দেশগুলোও তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণযোগ্য সীমা অতিক্রম করেছে এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এই হামলাকে পুরো লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত বলে উল্লেখ করেন। চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বোরিক উদ্বেগ প্রকাশ করে ভেনেজুয়েলার সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানান।
কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াছ-কানেল যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ফৌজদারি হামলার’ জন্য দায়ী করেন। উরুগুয়ে জানায়, তারা সামরিক হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে এবং পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ভেনেজুয়েলায় নিরাপদ ও বিচক্ষণ ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র দেশটির পরিস্থিতি ‘পরিচালনা’ করবে। এদিকে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জাভিয়ার মিলেই এই ঘটনাকে ‘স্বাধীনতার অগ্রযাত্রা’ বলে স্বাগত জানিয়েছেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস বলেন, মাদুরোর বৈধতা নেই এবং ভেনেজুয়েলায় শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার পালাবদল হওয়া উচিত। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁও গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে মত দেন। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ সতর্ক করে বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এড়িয়ে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা জরুরি।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এই অভিযান আন্তর্জাতিক আইনের জন্য ‘বিপজ্জনক নজির’ তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এই অভিযান নিয়ে মতভেদ দেখা গেছে। ডেমোক্র্যাট সিনেট নেতা চাক শুমার বলেন, কংগ্রেসের অনুমোদন ও স্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া বেপরোয়া সিদ্ধান্ত। বিপরীতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের নেতৃত্বের প্রশংসা করেছেন।
এদিকে ভেনেজুয়েলার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো কাবেইয়ো জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই হামলার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা