আপসহীন সংগ্রামী এক কিংবদন্তির বিদায়

মহীয়সীর মহাপ্রয়াণ। স্মরণ যাঁর চির অম্লান। রাজনীতি ও গণতন্ত্রের সৌন্দর্য, মাধুর্য আর মুগ্ধতা ছড়ানো এক আপসহীন সংগ্রামী এক কিংবদন্তির বিদায়। হাজারো প্রতিকূলতার মুখেও অঙ্গীকার, সাহস ও দৃঢ়তা দেশে কোটি মানুষের হৃদয়ে সম্মানের আসনে বসিয়েছে। বিদায় গণতন্ত্রের মাতা বেগম খালেদা জিয়া। আপনার কর্মগুণেই দেশ ও দেশের জনগণ আপনাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখবে যুগ-যুগান্তর।
বেগম খালেদা জিয়াকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আদর্শ ও অনমনীয় ভূমিকার জন্যই তিনি দেশ ও জনগণের কাছে আজও ‘আপসহীন নেত্রী’। বেগম খালেদা জিয়া শুধু দেশের প্রথম একজন নারী প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না বরং তিনি ছিলেন সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারী নেতৃত্বের এক শক্তিশালী প্রতীক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার মতো খুব কম নেতা ও নেত্রীই এত শ্রদ্ধা, বিতর্ক ও ধৈর্যের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে তিনি ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এই উপাধিটি তিনি পেয়েছেন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর ধারাবাহিক দৃঢ় অবস্থান, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় লড়াইয়ে কারণে।
গণতন্ত্র, মর্যাদা ও জবাবদিহিতে বিশ্বাসী অনেক বাঙালির কাছে তিনি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছেন। চার দশকের বেশি সময়ের রাজনৈতিক যাত্রায় তিনি জয় দেখেছেন, হার মেনেছেন, কারাবরণ করেছেন, আবার ঘুরেও দাঁড়িয়েছেন। আর এভাবেই গণতন্ত্র, মর্যাদা ও জবাবদিহিতায় বিশ্বাসী বহু মানুষের কাছে দৃঢ়তার প্রতীক হয়ে ওঠেন তিনি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়ার নাম উচ্চারিত হলেই এক ধরনের নীরব দৃঢ়তা অনুভূত হয়। তিনি শুধু একটি রাজনৈতিক দলেরই প্রধান নন। তিনি একটি সময়, একটি সংগ্রাম এবং একটি ভিন্ন রাজনৈতিক তথা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রতীকও।
বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্ব অনন্য। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনি অনন্য চরিত্রের অধিকারী। শুধু আপসহীনতার জন্য নয়, ত্যাগ স্বীকার ও কষ্ট সহ্য করার অপরিসীম ক্ষমতা ছিল তাঁর। এ ধরনের চরিত্র খালেদা জিয়া পেয়েছিলেন তাঁর মা-বাবা এবং স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন, জনপ্রিয়তার বলে বলীয়ান।
যেমন সম্মান জোর করে আদায় করা যায় না, আবার ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করেও তা পাওয়া যায় না। এটি মানুষের কাজ, আদর্শ ও চরিত্রের নিরব মূল্যায়নের ভিত্তিতে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি হয়। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জোর করে আদায় করা শ্রদ্ধা স্থায়ী হয় না, কিন্তু প্রকৃত সম্মান ঠিকই থেকে যায়-যার এক জলন্ত উদাহরণ বেগম খালেদা জিয়া।
গত ৩০ ডিসেম্বর ছিল জাতীয় প্রেসক্লাবের বার্ষিক সাধারণ সভা। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর খবরে শোকে যেন কাঁদছিলো প্রাণ-প্রকৃতিও। কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে ক্লাবে গিয়ে দেখলাম শোকের অংশ হিসেবে স্থাগিত করা হয় সাধারণ সভার আনুষ্ঠানিকতা। তবে মঞ্চে বেগম খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করা হয়। এরপরই শোকাতুর সহযোদ্ধা সাংবাদিকদের সাথে ক্লাবের টিভি রুমে বসে দেখলাম জাতির উদেশ্যে দেয়া প্রধান উপদেষ্টা ভাষণ। তিনি ঘোষণা করালেন একদিনের সাধারণ ছুটি ও তিনদিনের রাষ্ট্রীয় শোক।
এর পরই সহযোদ্ধা সাংবাদিক মো. এনামুল ইসলাম তুহিন ও জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য এইচ এম আল-আমিনের সাথে কথা হচ্ছিল দেশের রাজনৈতিক নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। ঠিক এই সময়ে আল আমিন বলে উঠলেন- জীবিত খালেদা জিয়ার চেয়ে মৃত খালেদা জিয়া দেশের অগুনতি নেতাকর্মীদের কাছে অনেক বেশি শক্তিশালী। বিগত সরকার কখন কিভাবে তাকে নির্যাতন চালিয়েছিল তারও এক পিরিস্তি তুলে ধরলেন। বললেন- সবমিলিয়ে বিগত সরকার এই মৃত্যুর দায় ভার কখনোই এড়াতে পারবে না।
সর্বশেষ শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী শাসন তাঁর শরীরের ওপর যে নির্যাতন চালায়, সেই ধকল নিয়েই চলে গেলেন খালেদা জিয়া। তবে তাঁর যে মানবিকতা, দেশপ্রেম, দৃঢ় চারিত্রিক গুণাবলি, গভীরে চিন্তা করতে পারার ক্ষমতা, সহনশীলতা- তা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
খালেদা জিয়া কখনো মনে প্রতিহিংসা পুষে রাখতেন না। তিনি সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চেয়েছেন। সেটাই ছিল তার দর্শন। কখনো এসবের প্রতিশোধ নিতে যাননি। তিনি জানতেন জনসমর্থনই তাঁর একমাত্র অবলম্বন। যার প্রমাণ পেয়েছেন, তিনি যখনই নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন, জিতেছেন। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন মহীয়সী নারী। তাঁর তুলনা তিনি নিজেই।
তাঁর সমর্থক ও লাখ লাখ সাধারণ মানুষের কাছে খালেদা জিয়া গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের এক মূর্ত প্রতীক। কারাজীবন, আইনি লড়াই এবং ব্যক্তিগত দুঃখ-কষ্টের মুখেও তিনি কখনো দমে যাননি। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অনন্য অনুপ্রেরণা।
প্রেসক্লাবের আরেক সদস্য কবি রফিক লিটন বললেন, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গড়ে তুলতে, কোটি মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে এবং নারী নেতৃত্বে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছেন। এক কথায় মাতৃত্ব ও নেতৃত্বে অনন্য এক নেত্রী।
একজন সাধারণ গৃহিণী থেকে তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার তাঁর এই যাত্রা স্থিতিস্থাপকতা, সাহস ও দৃঢ়তার এক গল্প। রাজনৈতিক উপাধির বাইরে তাঁর উত্তরাধিকার হলো— তিনি এই বার্তা রেখে গেছেন যে, সততা, অধ্যবসায় এবং সত্যের অন্বেষণ সবচেয়ে কঠিন ঝড়কেও মোকাবিলা করতে পারে।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। দেশ পরিচালনার পাশাপাশি বারবার তিনি নির্যাতিত হয়েছেন। মিথ্যা মামলায় কারাবরণ করেছেন। তাঁকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার তার দুই সন্তানের মধ্যে ছোট ছেলে মারা যান নির্বাসনে। তাদের সংসার আর কখনো এক ছাদের নিচে রাত্রিযাপনের সুযোগ পায়নি।
দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী : দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর নেতৃত্ব জনজীবনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর তিন মেয়াদে তিনি বেশকিছু জনগুরুত্বপূর্ণ কাজ বাস্তবায়ন করেন। এর মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন, দশম শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিদ্যুতায়ন ও নিরাপদ পানীয় জলের ব্যবস্থা, সেলুলার এবং আইএসডি সেবার মাধ্যমে টেলিযোগাযোগের অগ্রগতি, ১ হাজারের বেশি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বাড়াতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ।
বেসরকারিকরণ বাড়ানো, আয়কর কমানো, আমদানি শুল্ক সহজ করা এবং মুক্তবাজার অর্থনীতিকে উৎসাহিত করে তিনি অর্থনীতিতে জিয়াউর রহমানের নীতিকে এগিয়ে নেন।
খালেদা জিয়া মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণেও কাজ করেছেন। তিনি ২০০১ সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করেন, বীর প্রতীক তারামন বিবিকে সম্মাননা দেন এবং ২০০৬ সালে বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফনের ব্যবস্থা করেন।
রাজনীতিতে আসা ছিল আকস্মিক ও বেদনাবহ : খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে আসা ছিল আকস্মিক ও বেদনাবহ। তিনি জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ব্যক্তিগত ট্রাজেডি এবং নেতৃত্বের হঠাৎ শূন্যতার কারণে।
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় তিনি রাজনীতির প্রতি তেমন আগ্রহী ছিলেন না। কিন্তু ১৯৮১ সালে তাঁর স্বামীর হত্যাকাণ্ড সব কিছু বদলে দেয়। ১৯৮৪ সালে বেগম জিয়া বিএনপির নেতৃত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। খুব কম সময়ের মধ্যেই এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মুখ্য ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
আশির দশকের মাঝামাঝি যখন এরশাদ সামরিক শাসনকে ‘নির্বাচনের’ মাধ্যমে বৈধ করার চেষ্টা করেন, তখন বিরোধী দলগুলো অংশ নেবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এমন প্রেক্ষাপটে বেগম খালেদা জিয়া কালজয়ী সিদ্ধান্ত নেন। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা দেন, নির্বাচন বর্জনের।
১৯৮৬ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নেননি। সামরিক শাসনের প্রভাবে নির্বাচনী পরিবেশে অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলে ৫ দফা দাবি উপস্থাপন করেন তিনি। বিশ্লেষকরা এটিকে সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন, যা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদদের থেকেও তাঁকে অনন্য করে তুলেছিল।
একই বছর তথা ১৯৮৬ সালের ১৩ অক্টোবর তাঁকে গৃহবন্দী করা হয়। কিন্তু মুক্তির পরও তিনি পিছু হটেননি। বরং সভা-সমাবেশ, ধর্মঘট, অনশন ও অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে নতুন করে লড়াই শুরু করেন। ১৯৮৮ সালে মার্চে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করে। সব প্রধান বিরোধী দল তখন সেই একতরফা ভোট বর্জন করে।
বেগম জিয়া তখনও ছিলেন পুরোপুরি আপসহীন। শাসক দল নিজেদের বিজয়ী ঘোষণা করলেও তিনি তা প্রত্যাখান করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এই নির্বাচন অবৈধ ছিল। অবশেষে তাঁর সেই দীর্ঘ লড়াই ফলপ্রসূ হয়।
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি ছিল বেগম খালেদা জিয়ার অদম্য নেতৃত্ব ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আপসহীন মনোভাব।
১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল এরশাদ পতনের পর প্রথম ভোট। বিএনপি ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪০টিতে জয় পায়। ওই সময় বেগম জিয়া নিজের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা পাঁচটি আসনেই জয়ী হন। এরপর দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
সরকারে গিয়েই তিনি কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও নীতিগত সংস্কার কার্যক্রম চালান। সেগুলো হল- ১২তম সংশোধনী পাস করে দেশে পার্লামেন্টারি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনেন। ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করেন। তাঁর শাসনামলে শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, অবকাঠামো ও জনকল্যাণ খাতে বিস্তৃত উদ্যোগ নেওয়া হয়।
প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, বেসরকারি ও দূরশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহ দেওয়ার মত উদ্যোগ সেসময় ব্যাপক আলোচিত হয়। পরিবেশ রক্ষায়ও তিনি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যার মধ্যে অন্যতম ছিল পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধকরণ। এছাড়া কর্মসংস্থান, কৃষি সংস্কার ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিও জোরদার করা হয়।
বেগম জিয়ার নেতৃত্ব ছিল নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধে পরিপূর্ণ। অনেকের মতে, তিনি একবার সিদ্ধান্ত নিলে সেখান থেকে পিছু হটতেন না। মিথ্যা মামলা, কারাবাস কিংবা নির্যাতন কোনো কিছুই তাঁর অবস্থান টলাতে পারেনি।
তাঁর মূলমন্ত্র ছিল, ‘বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হলে, আমি সমৃদ্ধ হব’ এবং ‘এই দেশই আমার একমাত্র ঘর।’ দৃঢ়তা যেমন খালেদা জিয়াকে জনপ্রিয় করেছিল, তেমনি ডেকে এনেছিল দুর্ভোগও। বারবার গ্রেফতার, মামলা, গৃহবন্দিত্ব সবই তাঁকে মেনে নিতে হয়েছে বিভিন্ন সরকারের আমলে।
২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত ‘ওয়ান ইলেভেন’ সরকারের সময়ও তিনি গ্রেফতার হন। সেসময় তাকে বিদেশে পাঠানোরও চেষ্টা করা হয়েছিল। পরে তাঁকে কারাগারে আটক রাখা হয়। একসময় ঢাকা সেনানিবাসের মইনুল রোডে অবস্থিত স্বামী ও সন্তানদের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটিও সরকার দখলে নেয়।
ওয়ান ইলেভেন সরকার ও পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় তিনি দণ্ডিত হন। তবে দেশি-বিদেশি বিশ্লেষকরা এই মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেন।
শারীরিক অসুস্থতা, দুর্বলতা ও হাসপাতালে যাতায়াতের মধ্যেও তিনি নিজের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে একচুল পরিমাণও সরে যাননি। কোনো ধরনের দয়া প্রার্থনা করেননি; নির্বাসনও চাননি। বরং সব পরিস্থিতিতে দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ের সম্ভাবনা কম জেনেও তিনি দলকে নির্বাচনমুখী করেন এবং ‘ব্যাকডোর’ সমঝোতার বদলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকেই বেছে নেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে গেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, দেশে গণতান্ত্রিক অনিশ্চয়তার সময়ে তাঁর অবস্থান আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল।
আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতীক এবং নারী শিক্ষার প্রসারে অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
হে প্রিয় দেশনেত্রী, আল্লাহ আপনাকে ইহকালীন জীবন যে সম্মান দিয়েছেন পরকালেও নিশ্চয়ই সর্বোচ্চ সম্মানিত করবেন। আমিন।
লেখক: মশিউর রহমান রুবেল
সাংবাদিক ও কলামিস্ট।