বুধবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
Natun Kagoj

জবাবদিহিতার অভাবে প্রতিটি মৃত্যু প্রতিরোধহীন

জবাবদিহিতার অভাবে প্রতিটি মৃত্যু প্রতিরোধহীন
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ঢাকায় নির্মাণাধীন একটি ফ্লাইওভারের কংক্রিট গার্ডার ভেঙে পড়ার ঘটনায় এক পরিবারের পাঁচজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছিলেন ২০২২ সালে । সেই ভয়াবহ দৃশ্য পুরো দেশকে কেঁপে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল, এবার হয়তো কিছু শিক্ষা নেওয়া হবে, নিরাপত্তা মানদণ্ডগুলো পুনর্বিবেচনা করা হবে। কিন্তু না—সময় কেটে গেছে, স্মৃতি ম্লান হয়েছে, আর অব্যবস্থাপনা আরও গভীর শিকড় গেড়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবার সেই ভয়াবহতা মনে করিয়ে দিয়েছে। রাজধানীর মেট্রোরেল প্রকল্পের একটি পিলারের বিয়ারিং প্যাড হঠাৎ নিচে পড়ে একজন পথচারীর মৃত্যু হয়েছে। এর আগেই বিমানবন্দর এলাকায় ফুটপাতে হাঁটতে থাকা তিনজনের ওপর পড়ে একটি প্রাইভেটকার, ঘটনাস্থলেই তিনজনের মৃত্যু হয়। গত জুলাইয়ে টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকায় ঢাকনাবিহীন ম্যানহলে পড়ে এক নারী পথচারী মারা যান।

এগুলো আর ‘দুর্ঘটনা’ নয়; এগুলো আমাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতাহীনতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। নাগরিক নিরাপত্তা এখন ভাগ্যের ওপর নির্ভর করছে। রাস্তায় হাঁটা, গাড়িতে ওঠা, এমনকি নিজের ঘরে থাকা—সবকিছুই অনিশ্চয়তায় ভরা।

একজন নাগরিক ও অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে প্রতিদিন এসব মৃত্যুর খবর দেখে মনে হয়, আমরা এক অনিরাপদ বৃত্তে আটকে আছি। প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন হয়েছে, কিন্তু মানুষের নিরাপত্তা তার কেন্দ্রবিন্দুতে নেই। নির্মাণ মান নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, নগর পরিকল্পনা—সবকিছুই যেন শুধুই প্রদর্শনী; বাস্তব প্রয়োগ নেই।

এ দেশে মৃত্যু এত সহজ হয়ে গেছে যে কখন, কোথায়, কীভাবে প্রাণ হারানো হবে—তা হয়তো স্বয়ং আজরাইলও জানেন না। কেউ ফ্লাইওভারের নিচে পড়ে মারা যাচ্ছেন, কেউ ফুটপাতে হাঁটতে গিয়ে, কেউ আবার রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে। অথচ প্রতিটি মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য ছিল, যদি সামান্য দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতা থাকত।

আমরা যারা তরুণ, আমরা প্রতিদিন এই বাস্তবতার সঙ্গে লড়ে যাচ্ছি। আমাদের স্বপ্নগুলো থেমে যাচ্ছে ভয় ও অনিশ্চয়তার দেয়ালে। মনে হয়, এই অনিরাপদ নগর, অনিশ্চিত দেশ ত্যাগ করলেই হয়তো কিছু শান্তি মিলবে।

কিন্তু দেশ ছেড়ে পালানো কোনো সমাধান নয়। এই বাস্তবতা থেকে বের হওয়ার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে—

১. নগর নির্মাণে কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড
সরকারি বা বেসরকারি যে কোনো নির্মাণ প্রকল্পে কাজ শুরু হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্প তদারকি সংস্থার পাশাপাশি একটি স্বাধীন নাগরিক নিরাপত্তা কমিশন গঠন করা জরুরি।

২. জবাবদিহিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা
দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু তদন্ত কমিটি নয়, দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রকৌশলী, ঠিকাদার বা কর্মকর্তারা অপরাধ করলে দায়মুক্তি পাবেন না—এই বার্তাটি বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।

৩. নগর পরিকল্পনায় ‘মানুষ’কে প্রাধান্য দিন
শহরের উন্নয়ন হবে মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্যকে কেন্দ্র করে—শুধু অবকাঠামোর বাহারি রূপ নয়। ফুটপাথ, রাস্তা, পার্কিং—সবকিছুর পরিকল্পনায় নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা মূল বিবেচনায় থাকতে হবে।

৪. নাগরিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণ
শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকা নয়; নাগরিক সমাজকেও আরও সচেতন হতে হবে। ঝুঁকি দেখলেই আওয়াজ তুলুন, প্রতিবাদ করুন, রিপোর্ট করুন। নাগরিক পর্যায়ের চাপই পরিবর্তন সম্ভব করে।

সবকিছু একদিনে বদলানো সম্ভব নাও হতে পারে, কিন্তু নীরব থাকলে কিছুই বদলাবে না। এখনই সময় দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার—যেখানে প্রতিটি জীবনের মূল্য থাকবে উন্নয়নের কেন্দ্রে, পিলারের নিচে নয়।


দৈএনকে/জে .আ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

সর্বশেষ