গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত, পুনর্নির্মাণের পথে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা

মিশরে স্বাক্ষরিত গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এটি “বিশ্বের জন্য একটি মহান দিন।” তিনি আরও জানান, গাজা যুদ্ধবিরতি এবং বন্দি বিনিময়ের জন্য তার পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে হামাস এবং ইসরায়েল উভয়ই একমত হয়েছে এবং চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
ট্রাম্প বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, “পুরো বিশ্ব এই বিষয়ে একত্রিত হয়েছে। এটি ছিল একটি দুর্দান্ত দিন, সকলের জন্য।” ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মেও তিনি লিখেছেন যে শিগগিরই সব জিম্মি মুক্তি পাবে এবং ইসরায়েল নির্দিষ্ট সীমানায় তাদের সৈন্যদের প্রত্যাহার করবে।
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারী জানিয়েছেন, মধ্যস্থতাকারীরা চুক্তির প্রথম পর্যায়ের সব বিধান এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় সম্মত হয়েছে। এর ফলে যুদ্ধের অবসান, ইসরায়েলি জিম্মি এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি এবং সহায়তার প্রবেশ নিশ্চিত হবে। বিস্তারিত তথ্য পরে ঘোষণা করা হবে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাগত জানিয়েছে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। চিফ অব স্টাফ ইয়াল জামির সব বাহিনীকে জিম্মি উদ্ধারের অভিযান পরিচালনার জন্য প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মধ্যেও ইসরায়েলি বিমান হামলা চালিয়েছে গাজা শহরে এবং বিশেষ করে উত্তর গাজার বিভিন্ন এলাকায়। গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-মুগাইর জানান, হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের উত্তর গাজায় না ফেরার বিষয়ে সতর্ক করেছে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্র আভিচায় আদ্রাই বলেন, উত্তরের এলাকা এখনও বিপজ্জনক। হামাসের শীর্ষ আলোচক খালিল আল-হায়্যা বলেন, তারা ইসরায়েলের ওপর ‘এক মুহূর্তের জন্যও ভরসা করেন না’ এবং যুদ্ধ সম্পূর্ণভাবে বন্ধের বাস্তব নিশ্চয়তা চান।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা গাজার শান্তির জন্য “সবচেয়ে ভালো প্রস্তাব।” তিনি উল্লেখ করেছেন, এটি আরব বিশ্বের জন্য গ্রহণযোগ্য এবং বাস্তবায়নযোগ্য। যদিও ইসরায়েল সম্পূর্ণভাবে এটি গ্রহণ করেনি। মস্কো গত দুই বছর ধরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সমালোচনা করেছে, একই সময়ে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করেছে। রাশিয়ার অবস্থান অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য সংকটের একমাত্র সমাধান হলো দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী যুদ্ধোত্তর গাজা প্রশাসনে আন্তর্জাতিক সংস্থা, সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ, নেতৃত্ব দেবে, যেখানে ট্রাম্প নিজেই নেতৃত্ব দেবেন। এই পরিকল্পনার সমর্থক আরব দেশগুলো আশা করছে, এর মাধ্যমে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের পথ খোলা যাবে। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু স্পষ্ট জানিয়েছেন, এমন কোনো স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েহিয়েল লেইটার জানিয়েছেন, নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা বৈঠকের পর ৭২ ঘণ্টার মধ্যে হামাসকে জীবিত জিম্মি মুক্তি দিতে হবে। যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে কিনা, তা নির্ভর করছে চুক্তি কতটা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয় তার ওপর।
ট্রাম্প ফক্স নিউজকে বলেছেন, শান্তি চুক্তির প্রথম পর্যায়ের পর গাজার পুনর্নির্মাণ শুরু হবে। এটি একটি ‘ভিন্ন বিশ্ব’ হবে, যেখানে গাজা নিরাপদ ও পুনর্গঠিত স্থান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এতে সহায়তা করবে।
গাজার এই যুদ্ধবিরতি চুক্তি একটি প্রথম ধাপ, যা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো এখনও রয়েছে—যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং ইসরায়েল-হামাস দ্বন্দ্বের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। বিশ্ব এখন মনোযোগ রাখছে গাজার শান্তি ও পুনর্গঠনের দিকে।
দৈএনকে/জে .আ