বিমার দাপট, ব্যাংকের ধস: শেয়ারবাজারে আস্থার সংকেত

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে বৃহস্পতিবারের (৪ সেপ্টেম্বর) লেনদেন ছিল বৈপরীত্যের এক দিন। বিমা খাতের প্রায় সবকটি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতের শেয়ার দরপতনের ফলে সার্বিক বাজারসূচক নিম্নমুখী হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, এক খাতের ইতিবাচক প্রবাহও বাজারকে টিকিয়ে রাখতে পারছে না, বরং ব্যাংক খাতের বড় প্রভাব সার্বিক সূচককে নিচে নামিয়ে দিচ্ছে।
শেয়ারবাজারে ব্যাংক খাত সবসময়ই একটি নিয়ামক খাত হিসেবে বিবেচিত হয়। ব্যাংকের শেয়ারের দরপতন হলে তা শুধু বাজারকে অস্থির করে না, বিনিয়োগকারীদের আস্থাকেও নড়বড়ে করে তোলে। শেষ ঘণ্টায় ব্যাংক খাতে “ঢালাও দরপতন” এর মাধ্যমে বৃহস্পতিবারের লেনদেন শেষ হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, বিনিয়োগকারীরা ব্যাংক খাতে আস্থা খুঁজে পাচ্ছেন না। প্রশ্ন জাগে, এর পেছনে কি শুধু তাৎক্ষণিক প্রভাবক আছে, নাকি গভীর কোনো আর্থিক সংকট বা অনিশ্চয়তা জমে উঠছে?
অন্যদিকে বিমা খাতের এমন দাপট শেয়ারবাজারে নতুন করে প্রাণের সঞ্চার করেছে। ৫৮টি বিমা কোম্পানির মধ্যে ৫২টির শেয়ার দাম বেড়েছে—এমন দৃশ্য বিরল। বিমা খাতের এই উত্থান সাময়িক আশার বার্তা দিলেও বাজারকে স্থিতিশীল করতে এটি যথেষ্ট নয়। কারণ বাজারের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য আর্থিক খাতের (বিশেষ করে ব্যাংক) সুস্থ অবস্থান অপরিহার্য।
দিনের শুরুতে সূচক বেড়ে যাওয়া এবং পরে দ্রুত পতন বিনিয়োগকারীদের মানসিক অস্থিরতার প্রতিফলন। একটি বাজার যখন বারবার এই রকম ওঠানামার শিকার হয়, তখন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরাও বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন।
বাজার বিশ্লেষকরা প্রায়ই অভিযোগ করেন যে, বাংলাদেশের শেয়ারবাজার মূলত গুজবনির্ভর এবং স্বল্পমেয়াদি জল্পনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এদিনের লেনদেনেও তার ছাপ দেখা গেছে। সিটি ব্যাংকের শেয়ারের লেনদেন সর্বাধিক হলেও, খাতজুড়ে ব্যাংকের দাম কমেছে। অর্থাৎ কয়েকটি কোম্পানি বাজারে সক্রিয় থাকলেও সামগ্রিক আস্থাহীনতা কাটছে না।
শেয়ারবাজারকে টেকসই করতে হলে, ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করা জরুরি। ঋণ ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। বিমা খাতের ইতিবাচক প্রবণতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া দরকার। শুধু একদিনের উত্থান নয়, বরং খাতটির সক্ষমতা ও স্বচ্ছতা বাড়াতে নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে (বিএসইসি) আরও সক্রিয় হতে হবে। ভেতরের কারসাজি, অস্বচ্ছ তথ্যপ্রবাহ ও গুজব ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন করা অপরিহার্য। কর সুবিধা, বন্ড বাজারের উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়ানো ছাড়া স্থিতিশীলতা আসবে না।
শেয়ারবাজার দেশের অর্থনীতির আয়না। বিমা খাতের উত্থান আশাব্যঞ্জক হলেও ব্যাংক খাতের দরপতন সার্বিক বাজারের জন্য অশনি সংকেত। শুধুমাত্র এক খাতের ভরসায় বাজার টেকসই হয় না। বিনিয়োগকারীদের আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে ব্যাংকসহ আর্থিক খাতকে সুদৃঢ় করতে হবে, বাজার নিয়ন্ত্রণে স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নইলে শেয়ারবাজার আবারও অস্থিরতার ঘূর্ণিপাকে পড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে।