মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয়: স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত

বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয়: স্বাধীনতার নতুন দিগন্ত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায় বাংলাদেশের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে। আদালত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন— (১) সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদকে মূল ১৯৭২ সালের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া, (২) ওই অনুচ্ছেদের আলোকে প্রণীত ২০১৭ সালের শৃঙ্খলাবিধি বাতিল, এবং (৩) বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় তিন মাসের মধ্যে প্রতিষ্ঠার নির্দেশ। এই তিনটি অংশই বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্বশাসনের জন্য অপরিহার্য এবং বহুল প্রতীক্ষিত পদক্ষেপ।

১৯৭২ সালের সংবিধানে অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ, পদোন্নতি, কর্মস্থল নির্ধারণ ও শৃঙ্খলা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত ছিল। কিন্তু ১৯৭৪ সালের চতুর্থ সংশোধনী এই কর্তৃত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করে। পরবর্তী সময়ে পঞ্চম ও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শের বিধান সংযোজিত হলেও কার্যত নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণই বহাল ছিল। এই ব্যবস্থার ফলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব হয় এবং জনগণের আস্থা নষ্ট হয়। হাইকোর্টের রায়ে এই ভুল শুধরে দেওয়া হলো। এখন থেকে সুপ্রিম কোর্টই অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণে সর্বময় কর্তৃত্বশালী সংস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো।

২০১৭ সালে প্রণীত জুডিসিয়াল সার্ভিস (শৃঙ্খলা) বিধিমালা ছিল নির্বাহী বিভাগের প্রভাব বিস্তারের অন্যতম হাতিয়ার। এই বিধিমালার ফলে অধস্তন আদালতের বিচারকদের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়েছিল। হাইকোর্ট সেটিকে বাতিল করে একটি স্বতন্ত্র বিচার কাঠামোর পথ সুগম করেছে। এর ফলে বিচারকরা আরও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনে সক্ষম হবেন।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো, সুপ্রিম কোর্টের অধীনে পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠার নির্দেশ। এখন পর্যন্ত বিচার বিভাগ প্রশাসনিকভাবে আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ফলে প্রভাব ও হস্তক্ষেপ এড়ানো সম্ভব হয়নি। পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বিচার বিভাগের প্রশাসনিক, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে আসবে। তবে এটি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। আমলাতান্ত্রিক প্রতিরোধ, রাজনৈতিক অনিচ্ছা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে এই উদ্যোগকে সফল করতে হবে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল আইনের শাসন নয়, গণতন্ত্রের ভিত্তি। জনগণ যদি বিশ্বাস করে আদালত নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত, তবে ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা দৃঢ় হয়। এই আস্থা গণতান্ত্রিক সমাজকে স্থিতিশীল করে এবং আইনের শাসনকে শক্তিশালী করে। হাইকোর্টের এই রায় সেই আস্থার পুনর্গঠন ও বিকাশের সুযোগ এনে দিয়েছে।

হাইকোর্টের এই নির্দেশ কেবল একটি আইনি রায় নয়; এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তবে বাস্তবায়নই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। সরকার, সুপ্রিম কোর্ট, আইনজীবী সমাজ এবং নাগরিকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া এই রায় কার্যকর হবে না। এখন সময় এসেছে, কথায় নয়, বাস্তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে প্রতিষ্ঠিত করার।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন