রাজনীতিতে শিষ্টাচার, শিষ্টাচারের রাজনীতি

— মীর নেওয়াজ আলী
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শালীনতা ও ভদ্রতা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য অশালীন স্লোগান, অশোভন ভাষা এবং কুৎসা রটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অথচ রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়; এটি আচরণ, নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের প্রতিফলন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ও কাদা ছোড়াছুড়ির যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে হতাশ করছে। টকশো, সমাবেশ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতাদের ব্যবহৃত অশ্লীল শব্দ শুধু প্রতিপক্ষকে ছোট করছে না, বরং জাতির কাছে নেতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবেই, তবে তা প্রকাশের ভাষা হতে হবে শালীন ও পরিমিত।
অতীতে আমরা দেখেছি অনেক নেতাকে, যারা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কারণে প্রতিপক্ষেরও শ্রদ্ধা অর্জন করেছিলেন। শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী কিংবা সৈয়দ আশরাফ হোসেন ছিলেন রাজনৈতিক ভদ্রতার উজ্জ্বল উদাহরণ। বর্তমানেও এমন কিছু নেতার নাম উচ্চারণ করা যায়, যারা প্রতিপক্ষ হয়েও সমীহ পান কেবল শিষ্টাচারের জন্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, রাজনৈতিক মঞ্চে আজ তাচ্ছিল্যপূর্ণ ভাষা যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে।
শিষ্টাচারহীনতা কেবল রাজনীতির পরিবেশকেই কলুষিত করছে না, বরং সমাজে বিভাজন, সংঘাত ও ঘৃণার আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অথচ আমাদের তরুণ প্রজন্ম ভিন্ন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল—শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের স্লোগান ছিল শালীন, সৃজনশীল এবং অনুপ্রেরণাদায়ী। তারা দেখিয়েছিল প্রতিবাদ করা যায়, কিন্তু ভাষায় অশ্লীলতা আনতে হয় না।
আমাদের ইতিহাসও শিক্ষা দেয়, ভদ্রতা দুর্বলতা নয়। মহান নেতারা প্রতিপক্ষকে সম্মান দিয়ে, শত্রুতা নয় বরং সহনশীলতার মাধ্যমে জনসমর্থন অর্জন করেছেন। জাতির সামনে আজ দুটি পথ—অহংকার, বিদ্বেষ ও অশালীনতার; কিংবা শিষ্টাচার, উদারতা ও সহমর্মিতার। কোন পথ আমরা বেছে নেব, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী বাংলাদেশের চরিত্র।
রাজনীতিতে মহানুভবতা ও শিষ্টাচার ফিরিয়ে আনাই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ উৎকৃষ্ট শিক্ষার প্রকৃত মানদণ্ড হলো ভদ্রতা। যদি তা অশোভনতা ও ঔদ্ধত্যে রূপ নেয়, তবে আমরা কেমন সমাজ নির্মাণ করতে চলেছি—সেটিই ভাবনার বিষয়।