স্বচ্ছ নির্বাচনই গণতন্ত্রের ভিত্তি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশন (ইসি) তাদের নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। রাজনৈতিক দল, অংশীজনের সংলাপ থেকে শুরু করে পোস্টাল ভোটিং, আইটি-ভিত্তিক প্রস্তুতি, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় সবকিছুই এই রোডম্যাপে অন্তর্ভুক্ত। এটি নিঃসন্দেহে একটি বিস্তৃত পরিকল্পনা। তবে পরিকল্পনা কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে তা জাতির আস্থার সংকট কাটাতে পারবে না। এ জন্য প্রয়োজন বাস্তবায়নে আন্তরিকতা, স্বচ্ছতা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক ঐকমত্য।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও প্রধান উপদেষ্টা ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে, রমজানের আগে ভোট হবে। সময়ের হিসাব করলে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধেই তফসিল ঘোষণা হবে। এর মানে হলো, মাত্র কয়েক মাস হাতে আছে। এই অল্প সময়ের মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদ, সীমানা নির্ধারণ, দল নিবন্ধন, আইন সংস্কার, পর্যবেক্ষক অনুমোদনসহ বহুমাত্রিক কাজ শেষ করতে হবে। তাই সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা অর্জন। সংলাপের মাধ্যমে ইসি যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে নির্বাচনের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। অতীত অভিজ্ঞতা বলে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছাড়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পূর্ণতা পায় না। তাই সংলাপ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করাই মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
রোডম্যাপে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে পোস্টাল ভোটিং ও প্রবাসীদের অংশগ্রহণে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। দীর্ঘদিন ধরেই প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। এবার যদি তারা সত্যিকার অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান, তবে নির্বাচনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র আরও দৃঢ় হবে। তবে প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে, না হলে এই উদ্যোগই বিতর্কের জন্ম দিতে পারে।
আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো আইন-শৃঙ্খলা। নির্বাচনের আগে, চলাকালীন এবং পরে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা ছাড়া কোনো নির্বাচনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এজন্য ইসিকে শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয়, প্রশাসনকেও নিরপেক্ষভাবে কাজে লাগাতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যবস্থাপনা ছাড়া জনগণকে ভোটকেন্দ্রে আনা সম্ভব নয়।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন কতটা দৃঢ় অবস্থান নিতে পারবে? গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এই প্রশ্নের ওপর। একটি স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নয়, বরং জাতির আস্থার পুনর্গঠনেরও পথ।
আমরা মনে করি, ইসির এই রোডম্যাপ কেবল পরিকল্পনা নয়’ এটি হতে হবে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের একমাত্র হাতিয়ার। জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে, আর যদি প্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হয় তবে আবারও আস্থাহীনতার অন্ধকারে ঢেকে যাবে দেশ। তাই এখনই সময়, কথার চেয়ে কাজে প্রমাণ করার।