বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে দায়িত্বশীল রাজনীতি ও নেতৃত্বের সংকট

বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের বহু দেশে একটি বড় সংকট হলো দায়িত্বশীল নেতৃত্বের অভাব। রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষার মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্র ও সমাজ পরিচালনার জ্ঞান অর্জন। অথচ বাস্তবতায় দেখা যায়, রাজনীতির নেতৃত্বে আসেন অনেকেই যাদের মূল পেশা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁরা নিজেদের পেশাগত কর্তব্যে অবহেলা করে রাজনীতিকে ব্যবহার করেন ক্ষমতা ও স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে। এর ফলে প্রকৃত রাজনীতি দুর্বল হয়, জনকল্যাণ ব্যাহত হয় এবং রাষ্ট্র কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথে অগ্রসর হতে পারে না।
প্রাচীন গ্রিসে দার্শনিক প্লেটো তাঁর Republic গ্রন্থে বলেছিলেন- “রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন জ্ঞানী ও প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরা।” ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সফল নেতৃত্বের মূল ভিত্তি ছিল রাজনৈতিক জ্ঞান ও রাষ্ট্রচিন্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন রাষ্ট্রচিন্তা ও সামরিক নেতৃত্বে অভিজ্ঞ ছিলেন।
ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর নেতৃত্বে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু ছিলেন ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও কূটনীতিতে দক্ষ।
তাঁরা রাজনীতিকে পেশা নয়, বরং দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছিলেন। এর ফলেই তাঁদের নেতৃত্বে জাতি পেয়েছে স্বাধীনতা, উন্নয়ন ও জাতিরাষ্ট্র গঠনের দিকনির্দেশনা।
একটি গবেষণায় (Transparency International Bangladesh, ২০২৩) দেখা গেছে- বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের প্রায় ৬০-৬৫% ব্যবসায়ী পটভূমি থেকে আসেন। আইন, শিক্ষা ও গবেষণামূলক পটভূমির প্রতিনিধিত্ব রয়েছে ১৫-২০% এর কম। রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানে শিক্ষিত প্রতিনিধিদের সংখ্যা অতি নগণ্য।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ড. এ.পি.জে. আব্দুল কালাম বলেছিলেন-“রাজনীতিতে আসা উচিত তাঁদের, যাঁরা রাষ্ট্রচিন্তা বোঝেন এবং জ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।” কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতায় পেশাগত দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত হয়ে রাজনীতিতে আসা অনেকে সেই যোগ্যতা থেকে বঞ্চিত। এতে পরিণতি হয়-
১. নীতি প্রণয়নে জনস্বার্থের পরিবর্তে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থ প্রাধান্য পায়।
২. প্রশাসনিক অদক্ষতা ও নীতির ধারাবাহিকতায় ঘাটতি দেখা দেয়।
৩. রাষ্ট্রবিজ্ঞানে শিক্ষিত তরুণরা রাজনীতিতে অনুৎসাহী হয়ে পড়েন।
৪. দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতি, দলীয়করণ ও রাজনৈতিক অব্যবস্থাপনা বৃদ্ধি পায়।
এবিষয়ে আমাদের করনীয় হচ্ছে-রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সামাজিক বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা। দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় শিক্ষাগত যোগ্যতা ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাকে প্রাধান্য দেওয়া। সংসদে পেশাভিত্তিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা— ব্যবসায়ী, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও গবেষক সবাই থাকলেও রাষ্ট্রচিন্তায় দক্ষ নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব গঠনে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করা।
রাজনীতি যদি জ্ঞান, দায়িত্ব ও নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তবে রাষ্ট্র অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাবে। কিন্তু অন্য পেশা থেকে এসে দায়িত্বে অবহেলা করে যারা রাজনীতিকে ব্যবহার করেন, তাঁরা দেশের জন্য সম্ভাব্য বিপর্যয়ের কারণ হতে পারেন। আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞানসম্পন্ন ও দায়িত্বশীল নেতৃত্বের উত্থান।