বিমানের নিরাপত্তা সংকটে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত হোক

বাংলাদেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমান সংস্থা, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। দেশের গৌরব ও আস্থার প্রতীক এই প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক অবস্থা আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে। একের পর এক ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটি, যাত্রীদের প্রাণহানির শঙ্কা, এবং বিশ্বব্যাপী দেশের ভাবমূর্তির ক্ষতি এসব ঘটনাই প্রমাণ করে যে এখানে দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, গাফিলতি ও পেশাগত দুর্বলতা বাসা বেঁধেছে।
বিমানের সর্বশেষ বিবৃতিতে দেখা যাচ্ছে, কর্তৃপক্ষ একদিকে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে, অন্যদিকে বদলি, শাস্তি ও শোকজ নোটিশ দিয়ে দায় নির্ধারণের চেষ্টা করছে। এ পদক্ষেপ অবশ্যই ইতিবাচক, তবে প্রশ্ন হলো, এগুলো কতটা কার্যকর হবে? তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিলেও যদি তার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার না হয় তাহলে কয়েক দিনের মধ্যেই এই উদ্যোগ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা নয়, ব্যবস্থাপনাগত দূরদর্শিতার অভাবকেও সামনে এনেছে। যেমন, বিদেশি স্টেশনে অতিরিক্ত যন্ত্রাংশের অভাবে জরুরি মুহূর্তে বিকল বিমান ঘন্টার পর ঘন্টা আটকে থাকা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এর ফলে যাত্রীদের ভোগান্তি তো হয়ই, পাশাপাশি বিমানের প্রতি আন্তর্জাতিক আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ পরিস্থিতি কাটাতে কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত চাকা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ মজুত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অনেক আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
তবে কেবল যন্ত্রাংশ মজুত রাখাই যথেষ্ট নয়। প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, কার্যকর ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট এবং অভিজ্ঞ জনবল গড়ে তোলা, এসবের সমন্বয় ছাড়া একটি এয়ারলাইন্স নিরাপদ হতে পারে না। বিমানের গাফিলতির ইতিহাস প্রমাণ করে, এখানে দায়বদ্ধতার জায়গায় বহুদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, অব্যবস্থাপনা ও অদক্ষতা স্থান দখল করে আছে। শুধু বদলি বা শোকজ নয়, প্রকৃত অপরাধী বা অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যাত্রী নিরাপত্তা। যারা জীবন বাজি রেখে বিমানে ভ্রমণ করেন, তাদের কাছে দায়িত্বশীল সেবা পাওয়াটা মৌলিক অধিকার। এখানে সামান্যতম অবহেলাও মেনে নেওয়া যায় না। বিমানের সাম্প্রতিক ঘোষণা অনুযায়ী, রাতের বেলা বিশেষ রক্ষণাবেক্ষণ শিফট চালু এবং নতুন মেকানিক নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, এগুলো আশার আলো দেখায়। তবে উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
জাতীয় পতাকাবাহী এই প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা দেশের ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করছে। তাই এবার আর কাগুজে তদন্ত বা প্রতীকী পদক্ষেপ নয়, প্রকৃত অর্থেই স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দক্ষতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবেই বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স আবার আস্থা ফিরে পাবে, আর দেশের মানুষের প্রাণ ও মর্যাদার নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।