ছদ্মবেশী নেতাদের চাঁদাবাজি: জননিরাপত্তা ও গণবিশ্বাসে কালো ছায়া

দেশে রাজনৈতিক ছদ্মবেশে সক্রিয় এক শ্রেণির সুবিধাবাদী ও অসাধু নেতা মব তৈরি করে অবাধে চাঁদাবাজি, ভীতি প্রদর্শন এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে চরমভাবে নষ্ট করছে। সাম্প্রতিক গুলশান চাঁদাবাজি কাণ্ডে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও জনমনে ক্ষোভ ছড়িয়েছে, যেখানে একজন ছাত্রনেতা স্বীকার করেছেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সরাসরি জড়িত থাকার কথা। অপরদিকে অভিযুক্ত উপদেষ্টারা সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন।
রাজধানীর গুলশানে সম্প্রতি সংঘটিত এক চাঁদাবাজি ঘটনায় ৩৫ মিনিট দীর্ঘ একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংগঠনের এক যুগ্ম আহ্বায়ক খোলাখুলিভাবে বর্ণনা করেছেন, কিভাবে একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক উপদেষ্টার উপস্থিতিতে একজন প্রাক্তন সংসদ সদস্যের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করা হয়। এ ঘটনার পর থেকে রাজনৈতিক মহলসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
এ ঘটনায় নাম আসা স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ শজীব ভূইয়ান অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেছেন, “৫ আগস্ট ২০২৪ এর পর থেকে অভিযুক্ত ছাত্রনেতার সাথে আমার কোনো যোগাযোগ নেই। অভিযোগগুলো রাজনৈতিকভাবে প্রণোদিত।”
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সাজ্জাদুল্লাহ আহমেদ একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন, যাতে প্রকৃত অপরাধীরা চিহ্নিত হয় এবং আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়। অপরদিকে, একাধিক ছাত্রনেতাকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ—৫০ লাখ টাকা চাঁদা নেওয়ার জন্য প্রাক্তন এমপিকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর তথ্যমতে, দেশের পরিবহন খাত, বাজার ও বাণিজ্যিক এলাকা থেকে প্রতিদিন গড়ে ২.২১ কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে, যার একটি বড় অংশের সাথে রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের যোগসূত্র আছে। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার, চাঁদা আদায় এবং প্রতিপক্ষকে ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা চলমান।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রশাসনের শিথিল মনোভাব, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি এই অপরাধের বিস্তারে প্রধান ভূমিকা রাখছে। চক্রবদ্ধভাবে সংঘটিত এসব অপরাধ রোধে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়; বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা, স্বচ্ছতা ও সামাজিক জবাবদিহিতা জরুরি।
জনবিশ্বাসের অবক্ষয় – রাজনৈতিক নেতাদের নাম চাঁদাবাজি ও সহিংসতায় উঠে আসা জনগণের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অর্থনৈতিক প্রভাব – ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তাহীনতা বিনিয়োগে অনীহা তৈরি করছে।
আইনি জটিলতা – রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মামলার সঠিক তদন্ত ব্যাহত হচ্ছে।
সামাজিক ক্ষতি – স্থানীয় পর্যায়ে ভীতি ও বিশৃঙ্খলা মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চাঁদাবাজি নতুন কিছু নয়, তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এর নৃশংসতা ও বেপরোয়াপনার নতুন মাত্রা উন্মোচন করেছে। যখন রাজনৈতিক পরিচয় অপরাধের ঢাল হয়ে দাঁড়ায়, তখন গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাঝে মাঝে অভিযান যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, জবাবদিহি, এবং অপরাধে জড়িত যেকোনো ব্যক্তিকে দলীয় পরিচয় নির্বিশেষে বিচারের মুখোমুখি করা।
অন্যথায়, দেশের অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি—সবই একে একে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
সময় এসেছে, রাজনীতির পবিত্র ক্ষেত্রকে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির দুষ্টচক্র থেকে মুক্ত করার জন্য সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার।