ফেসবুকে ডলার ইনকামের অতি লোভ, বেহায়াপনা এবং পরকীয়া

আমরা সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম কিংবা অন্য কোন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে থাকি সাময়িক বিনোদন, যোগাযোগ রক্ষা, সাম্প্রতিক বিষয়গুলোতে নজর রাখাসহ ইত্যাদি ইতিবাচক কাজে। কিন্তু বিভিন্ন গবেষণা বলছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো যখন থেকে ছবি এবং ভিডিওতে অর্থ দেওয়ার প্রচলন করেছে, তখনই ভয়ংকর হারে বেড়েছে একটা শ্রেণীর নারীদের বেহায়াপনা এবং পরকীয়া।
দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গবেষণা বলছে, ফেসবুক আইডি কিংবা পেইজ মনিটাইজেশন পাওয়ার পরে আপলোডকৃত ছবি এবং ভিডিও থেকে সেন্ট এবং ডলার আসে। এই ডলার আয়ের লক্ষ্য থেকেই মূলত শুরু হয় এক শ্রেণীর নারীদের ফেসবুকে বেহায়াপনা ও অশ্লিলতা। তারা ডলার কিংবা সেন্ট উপার্জন করতে মরিয়া হয়ে দেশি এবং প্রবাসীদের সাথে গভীর সখ্যতা গড়ে তুলে। নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পরে অসামাজিক কর্মকান্ড তথা পরকীয়ার মতো ভয়াল থাবায়।
পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়- বিশেষ করে এক ধরনের নারী ফেসবুক ব্যবহারকারীরা ডলার ইনকামের নেশায় এতটাই আসক্ত হয়ে পড়েন যে - তারা দ্রুত ফ্যান-ফলোয়ার বাড়ানোর জন্য বড় ফ্যানফলোয়ারের ফেসবুক আইডি/পেইজের মালিক এবং টার্গেটেড প্রবাসীদের ফেসবুক লাইভে যুক্ত হয়। পরে তারা সেই লাইভগুলো শেয়ার করে পুরস্কার হিসেবে 'স্টার' অর্জন করে নেন। এতে করে যেমন ফলোয়ার বাড়ে তেমন সেন্ট তথা ডলার নিজের ফেসবুক আইডিতে যুক্ত হয়।
এখানে সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো। গবেষণা বলছে, এই শ্রেণীর নারীরা তার ফেসবুকে ফ্যানফলোয়ার বাড়াতে এবং ডলার উপার্জন করতে প্রবাসীদের সাথে ইনবক্সে সখ্যতা গড়ে তুলে। কেননা প্রবাসীরা ফেসবুকে অনেক টাকা বিনিয়োগ করে অসংখ্য স্টারের মালিক হয়েছেন। সেখান থেকে পছন্দের ব্যক্তিদের তারা স্টার উপহার প্রদান করেন। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগান অসত উদ্দেশ্যের ব্যক্তিরা। মূলত: ওই শ্রেণীর নারীদের এই সখ্যতার পেছনের মূল উদ্দেশ্য প্রবাসীরা যেন তাদের প্রমোট করে ফেসবুকে পোস্ট দেয়। এভাবেই এক পর্যায়ে তারা পরকীয়ায় লিপ্ত হয়ে যায়।
বছর কয়েক আগেও অনেক নারীরা ফেসবুক ব্যবহার করেছে। তখন এই প্লাটফর্মে নারীরা ছিল খুবই শালীন এবং মার্জিত। ফেসবুক কর্তৃপক্ষ ডলার সিস্টেম চালু করার পরেই ওইসব নারীরা ফেসবুকের টার্গেট পূরণ করার উদ্দেশ্যে, নিজের ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দেয়ার পাশাপাশি পরকীয়ার ফাঁদে পড়ে বিলিয়ে দিচ্ছে নিজের মূল্যবান সম্ভ্রম। ফেসবুকে পরিচয়ের পরে প্রবাসীর বাড়িতে তরুণীর বিয়ের দাবিতে অনশন- এমন খবর প্রায়শই গণমাধ্যমের শিরোনাম হতে দেখা যায়।
সম্প্রতি আমার পরিচিত এক ধার্মিক ভদ্র নারীর সাথে কথা হয়। কয়েক বছর আগেও তাকে কখনো ফেসবুকে তেমন ছবি শেয়ার করতে দেখা যেত না। ছবি ছাড়লেও সেটা ছিল শুধু মুখমন্ডল বের করা শালিনতা বজায় রাখা ছবি। আমরা যেটাকে শালীন ছবি বলে থাকি। কিন্তু হঠাৎ করে তার ফেসবুকে দেখা গেল, তিনি ওড়না ছাড়া, মাথার চুল প্রদর্শন করে, ঠোঁটে লিপিস্টিক দিয়ে, নানান রং ঢং করে ফেসবুকে প্রতিদিন নিয়ম করে একাধিক ছবি পোস্ট করছেন।
এরইধারাবাহিকতায় হঠাৎ একদিন তার সাথে কথা হলে তিনি এর পিছনের রহস্য উন্মোচন করেন। ওই ভদ্র ও ধার্মিক মহিলা বলেন, আমি এখন ফেসবুকে মনিটাইজেশন পেয়েছি, এখান থেকে আমার সেন্ট ও ডলার ইনকাম আসে। সেজন্য এখন বেশি বেশি ছবি আপলোড করি। শুধু ছবি আপলোড করিনা। আমি ভিডিও আপলোড করে থাকি। আমার ফেসবুক আমাকে সাপ্তাহিক একটা টার্গেট দেয়। সেই টার্গেট পূরণ করতে ফেসবুককে দিনের তিন ভাগের দুই ভাগ সময় দিচ্ছি।
অবাক হয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম। আপনি আগে তো বেশ শালীন ছবি ছাড়তেন। তবে এখন কেন আপনার টাইমলাইনে অতিমাত্রায় আধুনিকতার ছোঁয়া দেখা যায় । জবাবে তিনি বলেন, আগে শুধু মুখমণ্ডল দেখা যায় এমন ছবি ছাড়তাম। তাতে ভিউ এবং রিচ কম হতো। ফলে ইনকামও হতো না। আর এখন মাঝে মাঝে পার্লার থেকে সাজুগুজু করে বিভিন্ন স্টাইলের ছবি তুলি। ছবিতে মাথার চুল না দেখালে, বাহারি রঙের লিপস্টিক না দিলে, ওড়না ব্যবহার না করলে বেশি রিচ হয়, বেশি ভিউ হয়, বেশি এনগেজমেন্ট হয় আর এসব কারণেই আমি বেশি ডলার উপার্জন করছি।
শুধু আমার পরিচিত ওই ভদ্র মহিলা নয়। বর্তমান বাংলাদেশে এমন হাজারো নারী রয়েছে। যারা ফেসবুকে মনিটাইজেশন পেয়ে নিজের সংসার, স্বামীর সেবা, সন্তানের যত্ন, পারিবারিক অন্যান্য দায়িত্ব ও কর্তব্য বেমালুম ভুলতে বসেছে। কেননা তার ফেসবুকের টার্গেট পূরণ করতে হয়। ফেসবুকের দেওয়া ওই টার্গেটে সাপ্তাহে নির্দিষ্ট পোস্ট, নির্দিষ্ট কমেন্ট, নির্দিষ্ট রিলস ভিডিও ছাড়া থেকে শুরু করে আরো অন্যান্য বিষয় রয়েছে। আর টার্গেট পূরণ করতে বাড়ছে পারিবারিক সংকট।
এমন বাস্তবতায় দেশের ঘরে-ঘরে বেড়েছে পরকীয়া। চাপা কষ্ট আর তীব্র অশান্তিতে রয়েছে অসংখ্য স্বামী-স্ত্রী। বিচ্ছেদের কারণে বাবা-মায়ের স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে হাজারো শিশু। অনেক স্থানে আবার সামাজিক ও পারিবারিক সুনাম ক্ষুন্ন হওয়ার ভয়ে এসব ঘটনা খুব সহসা হয় না খবর। ভেতর ভেতর জ্বলে পুড়ে ছারখার হচ্ছে অনেকে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের সামাজিক অবক্ষয় হাওয়ার পাশাপাশি নিদারুণ কঠিন বাস্তবতার সম্মুখীন হচ্ছে অগণিত পরিবার।
ফেসবুকের মনিটাজেশন, অতি উৎসাহী ও উচ্চভিলাষী নারীদের আবেগি কর্মকান্ড, ডলার তথা সেন্ট উপার্জনের তীব্র লোভ, ফ্যান ফলোয়ার বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন লাইভে যুক্ত হয়ে বেগানা পুরুষদের সান্নিধ্যে যাওয়া, অসুস্থ বিনোদনের চর্চা করা- ব্যক্তি, সমাজ তথা রাষ্ট্রের জন্য অশনি সংকেত। তাই এখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরো বেশি সতর্ক ও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ মহল।
লেখক: এনামুল হক এনা
গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থী, ঢাকা 'ল' কলেজ