ডলি পার্টনের মৃত্যুতে কান্ট্রি সংগীতে এক যুগের অবসান

কান্ট্রি সংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ডলি পার্টন আর নেই। গায়িকা, গীতিকার, অভিনেত্রী ও উদ্যোক্তা হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পাওয়া এই মার্কিন শিল্পী মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) ৮০ বছর বয়সে মারা গেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।
ছয় দশকের বেশি সময়ের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে ডলি পার্টন শুধু সংগীতেই নিজের অবস্থান তৈরি করেননি; অভিনয়, ব্যবসা, টেলিভিশন ও জনকল্যাণমূলক কাজেও রেখে গেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। তার মৃত্যু তাই শুধু একজন শিল্পীর বিদায় নয়, মার্কিন জনপ্রিয় সংস্কৃতির দীর্ঘ এক অধ্যায়েরও অবসান।
দরিদ্র পরিবার থেকে সংগীতের শীর্ষে
১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম ডলি পার্টনের। ১২ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। আর্থিক সংকটের মধ্যেই ছোটবেলায় সংগীতের প্রতি তার গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। অল্প বয়সেই গান লেখা শুরু করেন তিনি।
পরে সংগীতের শহর ন্যাশভিলে পাড়ি জমান ডলি। সেখান থেকেই শুরু হয় পেশাদার সংগীতজীবনের পথচলা।
১৯৬৭ সালে ‘হ্যালো, আই’ম ডলি’ অ্যালবামের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ডিং ক্যারিয়ার শুরু করেন তিনি। এরপর দ্রুতই কান্ট্রি সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় শিল্পী হয়ে ওঠেন। ১৯৭০ সালে ‘জশুয়া’ গান দিয়ে প্রথমবার কান্ট্রি চার্টের শীর্ষে জায়গা করে নেন।
তবে ১৯৭৩ সালের ‘জোলিন’ গানটি তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ পরিচিতি এনে দেয়। সময়ের সঙ্গে গানটি কান্ট্রি সংগীতের অন্যতম কালজয়ী সৃষ্টি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ দিয়ে বিশ্বজয়
ডলি পার্টনের ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় সৃষ্টি ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। ১৯৭৪ সালে নিজের কণ্ঠে গানটি প্রকাশ করেন তিনি। পরে ১৯৯২ সালে হুইটনি হিউস্টন ‘দ্য বডিগার্ড’ সিনেমার জন্য গানটির নতুন সংস্করণ করেন।
হিউস্টনের কণ্ঠে গানটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় এবং আন্তর্জাতিক সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম সফল গানে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে ডলি পার্টনের লেখা গান নতুন প্রজন্মের কাছেও ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
সংগীতের পাশাপাশি হলিউডেও সাফল্য
সংগীতের বাইরে অভিনয়েও নিজের প্রতিভার প্রমাণ দেন ডলি। ১৯৮০ সালে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে ‘৯ টু ৫’ সিনেমায় অভিনয় করেন। সিনেমাটির জন্য গাওয়া একই নামের গানটি তাকে অস্কারে মনোনয়ন এনে দেয়।
পরবর্তী সময়ে ‘দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস’ এবং ‘স্টিল ম্যাগনোলিয়াস’-এর মতো সিনেমাতেও অভিনয় করেন তিনি।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারে প্রায় ৫০টি স্টুডিও অ্যালবাম প্রকাশ করেন ডলি। তার রেকর্ড বিক্রি হয়েছে ১০ কোটিরও বেশি। এমিলু হ্যারিস, লিন্ডা রনস্ট্যাড, লরেটা লিন ও উইলি নেলসনের মতো শিল্পীদের সঙ্গেও কাজ করেছেন তিনি।
কেনি রজার্সের সঙ্গে ১৯৮৩ সালে গাওয়া ‘আইল্যান্ডস ইন দ্য স্ট্রিম’ বিলবোর্ড হট ১০০-এর শীর্ষে উঠে আসে। এতে তার জনপ্রিয়তা কান্ট্রি সংগীতের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বিস্তৃত হয়।
অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা
ক্যারিয়ারে গ্র্যামিসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন ডলি পার্টন। ২০২২ সালে তাকে রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
কান্ট্রি সংগীতে নারী শিল্পীদের দীর্ঘস্থায়ী ক্যারিয়ার ও সাফল্যের ক্ষেত্রেও তার অবস্থান ছিল অনন্য। গান লেখা, পরিবেশনা ও সংগীতের বাইরে নানা সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক।
ব্যবসা ও মানবসেবায়ও অনন্য
ডলি পার্টন ছিলেন সফল উদ্যোক্তাও। টেনেসির একটি থিম পার্কে বিনিয়োগের পর সেটি ‘ডলিউড’ নামে পরিচিতি পায়। পাশাপাশি মানুষের কল্যাণে কাজ করতেও তিনি ছিলেন সক্রিয়।
১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ডলিউড ফাউন্ডেশন। শিশুদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে তার নেওয়া উদ্যোগ বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।
করোনাভাইরাস মহামারির সময় ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির চিকিৎসা গবেষণায় ১০ লাখ ডলার অনুদান দেন ডলি। ওই গবেষণার সঙ্গে মডার্নার কোভিড-১৯ টিকা তৈরির কাজের যোগসূত্র ছিল।
মানবসেবায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২২ সালে জেফ বেজোস ও লরেন সানচেজ তাকে ১০ কোটি ডলারের ‘কারেজ অ্যান্ড সিভিলিটি অ্যাওয়ার্ড’ দেন।
দীর্ঘ দাম্পত্যজীবন
ব্যক্তিজীবনে ডলি পার্টনের দীর্ঘদিনের সঙ্গী ছিলেন কার্ল ডিন। ২০২৫ সালের মার্চে ৮২ বছর বয়সে মারা যান তিনি। প্রায় ছয় দশকের দাম্পত্যজীবনে তাদের কোনো সন্তান ছিল না।
দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে সংগীতের শীর্ষে পৌঁছানো, নিজের লেখা গানকে বিশ্বসংগীতের অংশ করে তোলা, হলিউডে সাফল্য অর্জন এবং মানুষের কল্যাণে কাজ—বহুমাত্রিক প্রতিভা ও অবদানে সমৃদ্ধ ছিল ডলি পার্টনের জীবন।
তার বিদায়ের মধ্য দিয়ে কান্ট্রি সংগীত হারাল এক কিংবদন্তিকে। তবে তার গান, অভিনয়, সৃষ্টিশীলতা ও মানবিক উদ্যোগ তাকে বিশ্বসংস্কৃতির ইতিহাসে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।