পার্বত্য জেলা পরিষদে দলীয় প্রভাবের অভিযোগ, প্রতিবাদ এনসিপির

পরিষদে দলীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়ার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সঙ্গে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে নির্বাচিত পরিষদ গঠনের দাবি জানিয়েছে দলটি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) এনসিপির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এসব দাবি জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও কৌশলগত অঞ্চল। এ অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অধিকার, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ এবং ন্যায়সংগত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকে কার্যকর ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এনসিপির অভিযোগ, ২০ আগস্ট গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা পরিষদে বিএনপি ছাড়া অন্যান্য রাজনৈতিক মত, সামাজিক শক্তি এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরের মানুষের প্রতিনিধিত্ব কার্যত নেই। দলটির মতে, এ ধরনের একতরফা প্রতিনিধিত্ব জেলা পরিষদের নিরপেক্ষতা, অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ও জনগণের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় স্বতন্ত্র ও সংবেদনশীল। এ অঞ্চলে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস রয়েছে। রাজনৈতিক দলের সক্রিয় পরিচয়ের বাইরে থেকেও বহু যোগ্য, দক্ষ ও জনসম্পৃক্ত মানুষ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় উন্নয়ন ও জনকল্যাণে কাজ করছেন। তাই জেলা পরিষদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়োগের প্রধান বিবেচনা হলে বড় একটি জনগোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত হতে পারে।
দলীয় প্রতিষ্ঠানের বদলে জনগণের প্রতিষ্ঠান চায় এনসিপি
এনসিপি মনে করে, পার্বত্য জেলা পরিষদ কোনো রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি জনগণের প্রতিষ্ঠান। তাই দলীয় আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা, জনসম্পৃক্ততা, স্থানীয় বাস্তবতা এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের ন্যায্য প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা উচিত।
দলটির ভাষ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো বৈচিত্র্যময় ও সংবেদনশীল অঞ্চলে জেলা পরিষদের অতিরিক্ত রাজনৈতিকীকরণ উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি জনগণের মধ্যে বৈষম্য, অবিশ্বাস ও রাজনৈতিক বিভাজন বাড়াতে পারে।
অনির্বাচিত পরিষদ নিয়ে প্রশ্ন
বিবৃতিতে প্রশ্ন তোলা হয়, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো আর কতদিন অনির্বাচিত ও মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
এনসিপি জানায়, ১৯৮৯ সালে পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন প্রণয়নের পর একই বছর পার্বত্য জেলাগুলোতে একবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত প্রত্যক্ষ নির্বাচন না হয়ে বিভিন্ন সময়ে সরকার মনোনীত বা অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের গণতান্ত্রিক অধিকার দীর্ঘদিন ধরে কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
দলটি বলেছে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে অনির্বাচিত ও দলীয়ভাবে প্রভাবিত স্থানীয় প্রতিষ্ঠান দেখতে চায় না তারা। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রত্যাশার সঙ্গে পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোকেও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন।
দ্রুত নির্বাচনের দাবি
এনসিপির মতে, অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদ সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা হতে পারে, তবে এটি কোনোভাবেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিত্বের বিকল্প নয়। তাই খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে সরাসরি ও অবাধ নির্বাচন আয়োজনের জন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থায় রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে যোগ্যতা, নিরপেক্ষতা, স্থানীয় জনগণের প্রতিনিধিত্ব এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কোনো একক রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের বিষয় নয়; এ অঞ্চলে বসবাসরত প্রতিটি মানুষের অধিকার। তাই জেলা পরিষদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সব জনগোষ্ঠীর সমান অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায়সংগত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এনসিপি বর্তমান রাজনৈতিকীকরণ ও একতরফা নিয়োগের প্রবণতা প্রত্যাহার করে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে।