ডিপিপির ফাঁকফোকরে অপচয়ের সুযোগ বন্ধ করতে হবে

সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য জনকল্যাণ ও দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন। জনগণের করের টাকা এবং রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদ ব্যয় করে এসব প্রকল্প নেওয়া হয়। তাই প্রতিটি প্রকল্পের পরিকল্পনা, ব্যয় নির্ধারণ, অনুমোদন ও বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাব বা ডিপিপি তৈরির ক্ষেত্রে যদি অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, কাজের পুনরাবৃত্তি, অযৌক্তিক ভ্রমণ, অতিরিক্ত পরামর্শক ব্যয় কিংবা নানা ধরনের ভাতা ঢুকে পড়ে, তাহলে প্রকল্পের উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে দেশের বিভিন্ন চলমান ও শেষ হওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের ডিপিপিতে এমন অসংখ্য অসংগতি উঠে এসেছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, একটি ডিপিপি অনুমোদনের আগে যখন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন, বিভিন্ন যাচাই-বাছাই কমিটি এবং শেষ পর্যন্ত একনেকের মতো একাধিক স্তর রয়েছে, তখন এসব অপ্রয়োজনীয় ও অসংগত ব্যয় কীভাবে অনুমোদন পায়?
ডিপিপি কোনো সাধারণ কাগজপত্র নয়। একটি প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা, সম্ভাব্য ব্যয়, বাস্তবায়ন পদ্ধতি, সময়সীমা ও প্রত্যাশিত ফলাফল নির্ধারণের ভিত্তি হলো এই দলিল। ফলে এখানে সামান্য ভুলও পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের আর্থিক অপচয়ের কারণ হতে পারে। অথচ কোনো কোনো প্রকল্পে একই ধরনের কাজের জন্য পৃথক খাতে বিপুল অর্থ বরাদ্দ, ভূমি অধিগ্রহণ না করেও সংশ্লিষ্ট খাতে অর্থ ব্যয়, সরকারি স্থাপনা ব্যবহার করেও অফিস ভাড়া বাবদ অর্থ রাখা, এমনকি মূল উন্নয়নকাজ শুরু না হলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক ব্যয় চালিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা সামনে এসেছে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, কোনো কোনো প্রকল্পে মূল কাজের তুলনায় প্রশাসনিক ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ের খাতই যেন বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। একটি প্রকল্পের অধীনে উপাসনালয় উন্নয়নের মতো মূল কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ না থাকলেও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, ভাতা, গাড়ি, প্রশিক্ষণ, সফটওয়্যার, আসবাবপত্রসহ নানা খাতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষেত্রে এটি কোনোভাবেই স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না।
একইভাবে প্রকল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন ‘শ্রান্তি ও বিনোদন’সহ নানা ধরনের ভাতা, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা অস্বাভাবিক পরামর্শক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে অল্পসংখ্যক বিদেশি প্রকৌশলীর জন্য বিপুল অর্থ বরাদ্দের পরিবর্তে দেশীয় প্রকৌশলীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা অনেক বেশি টেকসই ও যুক্তিসংগত। এতে একদিকে ব্যয় কমবে, অন্যদিকে দেশের নিজস্ব দক্ষ জনবল গড়ে উঠবে।
ডিপিপিতে অনিয়মের পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়েও নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। অযোগ্য ঠিকাদারকে কাজ দেওয়া, অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও বিল পরিশোধ, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য জামানত না কাটা, অনুমোদিত নকশা উপেক্ষা করে অর্থ ব্যয় কিংবা কাজ না করেও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার মতো অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। এসব ঘটনায় শুধু প্রকল্প পরিচালক বা ঠিকাদারকে দায়ী করলেই হবে না; যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসব সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে, সেই পুরো ব্যবস্থাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
প্রকল্পের ডিপিপি তৈরির আগে সার্ভে ও ফিজিবিলিটি স্টাডি করা বাধ্যতামূলক হলেও বাস্তবে তা যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বাস্তব চাহিদা, সম্ভাব্য ব্যয় ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা যাচাই না করে প্রকল্প গ্রহণ করলে পরে সময় ও ব্যয় বাড়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এর ফলে একটি প্রকল্পের জন্য জনগণের অর্থ থেকে যে পরিমাণ ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ খরচ হতে পারে।
আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় এমন একটি সংস্কৃতি তৈরি করা দরকার, যেখানে প্রকল্পের আকার বড় করাকে সাফল্য হিসেবে দেখা হবে না; বরং কম ব্যয়ে নির্ধারিত সময়ে সর্বোচ্চ জনকল্যাণ নিশ্চিত করাকেই সাফল্যের মাপকাঠি ধরা হবে। প্রতিটি ব্যয় খাতের পেছনে সুস্পষ্ট প্রয়োজনীয়তা, যৌক্তিকতা ও হিসাব থাকা জরুরি। নতুন কোনো খাত যুক্ত করার ক্ষেত্রে কেন সেটি প্রয়োজন, কত টাকা লাগবে এবং প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী—এসব বিষয় লিখিতভাবে উল্লেখ করা উচিত।
ডিপিপি অনুমোদনের বহুস্তরীয় ব্যবস্থা থাকলেও যদি একই ধরনের অনিয়ম বারবার ঘটে, তাহলে বোঝা যায় সমস্যাটি কেবল ব্যক্তিগত নয়, প্রাতিষ্ঠানিকও। তাই যাচাই-বাছাইয়ের নামে কাগুজে আনুষ্ঠানিকতা না করে প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজন ও সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে কঠোর পর্যালোচনা করতে হবে। অনুমোদনের পরও নিয়মিত পরিবীক্ষণ এবং ব্যয়ের প্রতিটি ধাপের নিরীক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রকল্পের রেট শিডিউল, ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও কাজের মান যাচাইয়ের উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে প্রযুক্তি কখনোই সুশাসনের বিকল্প নয়। তথ্যের স্বচ্ছতা, স্বাধীন নজরদারি, কার্যকর অডিট এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা—এসব নিশ্চিত না হলে প্রযুক্তির সুফলও সীমিত থাকবে।
রাষ্ট্রের অর্থ জনগণের অর্থ। সেই অর্থ অপচয় বা আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, জনগণের সঙ্গে অন্যায়ও। তাই ডিপিপি তৈরির প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাদ দিয়ে প্রকল্পের মূল লক্ষ্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ থেকে প্রকল্প পরিচালক ও ঠিকাদার—যে পর্যায়েই অনিয়ম প্রমাণিত হবে, সেখানে কার্যকর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা নয়, জনগণ কতটা সুফল পেল—সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড। ডিপিপির ফাঁকফোকর বন্ধ করা গেলে একদিকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় কমবে, অন্যদিকে সীমিত সম্পদ দিয়ে আরও বেশি জনকল্যাণমূলক কাজ বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ বিষয়ে আর কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।