হিজরি নববর্ষ: যেভাবে খলিফা ওমর (রা.) চালু করেন ইসলামি বর্ষপঞ্জি

হিজরি নববর্ষ মুসলিম উম্মাহর ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ধর্মীয় পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশ্বের অধিকাংশ দেশ আজ গ্রেগরিয়ান বা খ্রিস্টীয় ক্যালেন্ডার ব্যবহার করলেও মুসলমানদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের সময় নির্ধারণ করা হয় হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী।
খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জি সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর আবর্তনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হলেও হিজরি ক্যালেন্ডার সম্পূর্ণভাবে চাঁদের গতিপথ অনুসরণ করে। এ কারণে হিজরি বছরের দৈর্ঘ্য সৌর বছরের তুলনায় প্রায় ১১ দিন কম। ফলে রমজান, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা ও হজের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো প্রতি বছর ভিন্ন সময়ে পালিত হয়।
হিজরি সালের সূচনা
ইসলামের প্রথম যুগে কোনো নির্দিষ্ট ইসলামি বর্ষপঞ্জি ছিল না। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগ এবং হজরত আবু বকর (রা.)-এর খেলাফতকালেও আনুষ্ঠানিকভাবে সাল গণনার নির্দিষ্ট পদ্ধতি চালু হয়নি। দাপ্তরিক প্রয়োজন থেকেই পরবর্তীতে এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, হিজরি ১৭ সালে হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) একটি সরকারি চিঠি পান, যেখানে মাসের নাম উল্লেখ থাকলেও বছর উল্লেখ করা হয়নি। এতে প্রশাসনিক কাজে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। বিষয়টি তিনি খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর নজরে আনেন।
এরপর খলিফা ওমর (রা.) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে একটি পরামর্শসভা আহ্বান করেন। সেখানে ইসলামি ইতিহাসের কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা হয়। কেউ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জন্মসাল, কেউ নবুয়তের সূচনা, আবার কেউ তাঁর ওফাতের বছরকে ভিত্তি করার প্রস্তাব দেন।
দীর্ঘ আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে মহানবী (সা.)-এর মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতকে ইসলামি ইতিহাসের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এই ঘটনাই ইসলামের সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় ভিত্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করেছিল।
সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খ্রিস্টীয় ৬২২ সালকে ইসলামি বর্ষপঞ্জির সূচনাবর্ষ হিসেবে নির্ধারণ করা হয় এবং এর নাম দেওয়া হয় ‘হিজরি সাল’।
কেন মুহাররম হলো বছরের প্রথম মাস?
ঐতিহাসিকভাবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরত সংঘটিত হয়েছিল রবিউল আউয়াল মাসে। তবে ইসলামি বছরের প্রথম মাস হিসেবে নির্ধারণ করা হয় মুহাররমকে।
এর অন্যতম কারণ ছিল, হজের মৌসুম শেষ হওয়ার পর মুহাররম মাস থেকেই আরব সমাজে নতুন কার্যক্রম শুরু হতো। পাশাপাশি এটি ইসলামপূর্ব যুগ থেকেই সম্মানিত ও যুদ্ধবিরতিপূর্ণ মাস হিসেবে পরিচিত ছিল।
আরবি মাসগুলোর ইতিহাস
ইসলামপূর্ব আরব সমাজে মানুষ কোনো নির্দিষ্ট সাল ব্যবহার করত না। বরং বড় কোনো ঘটনা বা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সময়ের হিসাব রাখা হতো। যেমন ‘আমুল ফিল’ বা হস্তীবর্ষ ছিল একটি বহুল পরিচিত সময়চিহ্ন।
তবে চান্দ্র মাসগুলোর নাম ছিল এবং সেগুলো প্রকৃতি, আবহাওয়া ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। পরবর্তীতে আরবের বিভিন্ন গোত্রপ্রধানের ঐকমত্যে বর্তমান মাসগুলোর নাম চূড়ান্ত করা হয়।
ইসলামি বর্ষপঞ্জির চারটি মাস—মুহাররম, রজব, জিলকদ ও জিলহজ—বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সময় থেকেই এসব মাসকে পবিত্র ও যুদ্ধনিষিদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হতো। ইসলাম আগমনের পরও সেই মর্যাদা বহাল থাকে।
ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতীক
হিজরি নববর্ষ শুধু একটি নতুন বছরের সূচনা নয়; এটি মুসলিম জাতির সংগ্রাম, ত্যাগ, আদর্শ ও আত্মপরিচয়ের স্মারক। হিজরতের ঘটনা মুসলমানদের জন্য সত্য, ন্যায় এবং ঈমানের পথে অবিচল থাকার এক অনন্য শিক্ষা বহন করে। তাই হিজরি নববর্ষ মুসলিম সমাজে ইতিহাসচেতনা ও আত্মবিশ্লেষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।