থ্যালাসেমিয়া রোধে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার পরামর্শ

দুই জন সুস্থ মানুষের ঘর আলো করে আসা একটি ফুটফুটে সন্তান যখন ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে যায় এবং পরে ধরা পড়ে সে 'থ্যালাসেমিয়া মেজর'-এ আক্রান্ত—তখন পুরো পরিবারের ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে। অথচ সামান্য সচেতনতা আর বিয়ের আগে মাত্র একটি রক্ত পরীক্ষাই পারতো এই করুণ ট্র্যাজেডি রুখে দিতে। থ্যালাসেমিয়া কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, এটি একটি সম্পূর্ণ জিনগত ব্যাধি যা বাবা-মায়ের অজান্তেই সন্তানের শরীরে সঞ্চারিত হয়।
১. ‘বাহক’ ও ‘রোগী’: পার্থক্য বোঝা জরুরি
থ্যালাসেমিয়ার বাহক (Carrier) মানে তিনি নিজে রোগী নন। তিনি একদম স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন এবং বাইরে থেকে কোনো লক্ষণই ধরা পড়ে না। কিন্তু যখন দুই জন বাহক বিয়ে করেন, তখনই তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর বা আজীবনের রোগী হওয়ার চরম ঝুঁকি তৈরি হয়।
২. বিপদের জিনগত সমীকরণ
বিজ্ঞান বলছে, প্রতিবার গর্ভধারণের সময় বাবা ও মা দুজনেই যদি বাহক হন, তবে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার ঝুঁকি থাকে ২৫%। এছাড়াও ৫০% ক্ষেত্রে সন্তান বাহক হতে পারে। অর্থাৎ, বাবা-মা বাহক হলে সুস্থ সন্তান পাওয়ার সম্ভাবনা কমে আসে, যা একটি পরিবারের জন্য আজীবনের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৩. শৈশবের যন্ত্রণা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়
একটি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রতি মাসে অন্যের শরীর থেকে রক্ত নিতে হয়। বারবার রক্ত নেওয়ার ফলে শরীরে জমে যাওয়া অতিরিক্ত আয়রন হৃৎপিণ্ড ও লিভার বিকল করে দেয়। এই দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা একদিকে যেমন শিশুর শৈশবকে কেড়ে নেয়, অন্যদিকে একটি মধ্যবিত্ত পরিবারকে আর্থিকভাবে নিঃস্ব করে ফেলে। এছাড়া বাবা-মায়ের মধ্যে যে চরম অপরাধবোধ (Parental Guilt) কাজ করে, তা অনেক সময় পরিবারে বিচ্ছেদের কারণও হয়ে ওঠে।
৪. সমাধানের পথ: Hb Electrophoresis পরীক্ষা
কপাল বা ভাগ্যের দোহাই না দিয়ে আধুনিক বিজ্ঞানের সাহায্য নেওয়াই হলো স্মার্ট প্যারেন্টিং।
-
বিয়ের আগে টেস্ট: পাত্র-পাত্রীর রক্তে Hb Electrophoresis পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে হবে তারা বাহক কি না। দুই জন বাহকের মধ্যে বিবাহ বন্ধন এড়িয়ে চলাই এই রোগ প্রতিরোধের প্রধান উপায়।
-
গর্ভাবস্থায় পরীক্ষা: যদি দম্পতিরা ইতোমধ্যেই বিবাহিত এবং বাহক হয়ে থাকেন, তবে গর্ভাবস্থার ১০-১২ সপ্তাহের মধ্যে CVS বা অ্যামনিওসেন্টেসিস পরীক্ষার মাধ্যমে ভ্রূণের অবস্থা জানা সম্ভব।
উপসংহার: আপনার একটি সচেতন সিদ্ধান্ত একটি নিষ্পাপ শিশুকে আজীবনের সুঁইয়ের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিতে পারে। বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার এই সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হোক আমাদের সামাজিক অঙ্গীকার।
দৈএনকে/জে, আ