ঈদের আগে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা

এবার ঈদুল ফিতরে টানা সাত দিনের ছুটি থাকায় ঘরমুখো মানুষের যাত্রা স্বস্তিদায়ক করার প্রত্যাশা করছে সরকার। তবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে উন্নয়নকাজ, সড়ক দখল, অবৈধ যানবাহনের স্ট্যান্ড, মহাসড়কের পাশে বাজার বসানো এবং সেতুর টোলপ্লাজায় ধীরগতির কারণে ঈদযাত্রায় দুর্ভোগের আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ঈদের আগের দুই দিন যানবাহনের চাপ বেড়ে গেলে যানজট ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তা, যাত্রী এবং পরিবহনচালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ঈদযাত্রায় গাজীপুরের অন্তত আটটি স্থানে যানজট ও ভোগান্তির আশঙ্কা রয়েছে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক দিয়ে চান্দনা চৌরাস্তা হয়ে ময়মনসিংহসহ পাঁচটি জেলার যানবাহন চলাচল করে। আবার একই মহাসড়ক দিয়ে কালিয়াকৈর হয়ে উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। ফলে স্বাভাবিক সময়েও এখানে যানবাহনের চাপ বেশি থাকে। ঈদের সময় চাপ বাড়লে যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
মহাসড়কের পাশে বাজার বসানো, সড়ক দখল, অবৈধ যানবাহনের স্ট্যান্ড এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করানোর কারণে যানবাহনের গতি কমে যায়। এতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ বাড়ে।
জানা গেছে, সম্ভাব্য ভোগান্তির আটটি স্থানের মধ্যে ছয়টি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এবং দুটি ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থিত। এসব এলাকায় ভাসমান বাজার, ব্যাটারিচালিত রিকশার চলাচল, অবৈধ স্থাপনা এবং যেখানে-সেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের কারণে যানজটের আশঙ্কা বাড়ছে। এতে ঘরমুখো যাত্রীদের কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক দিয়ে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। প্রতি বছর ঈদযাত্রার সময় এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা ত্রিমোড়ে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়। এছাড়া মহাসড়কের দুই পাশে অবৈধ দখলের কারণে অনেক জায়গায় সড়ক সংকুচিত হয়ে গেছে।
গাজীপুর অঞ্চলে পোশাক কারখানাগুলো ছুটি দিলে হঠাৎ করে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। ফলে সড়ক ব্যবস্থাপনায় সামান্য ঘাটতি থাকলেও বড় ধরনের যানজট তৈরি হতে পারে।
যেসব স্থানে যানজটের শঙ্কা
যাত্রী ও পরিবহনচালকদের মতে, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী স্টেশন রোড, কলেজ গেট, বোর্ড বাজার, চান্দনা চৌরাস্তা, সদর উপজেলার ভবানীপুর, বাঘের বাজার, শ্রীপুর উপজেলার গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ি, মাওনা চৌরাস্তা, এমসি বাজার, নয়নপুর ও জৈনাবাজার এলাকায় যানজটের আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া চান্দনা চৌরাস্তার ফ্লাইওভার এখনো চালু না হওয়ায় সেখানেও ভোগান্তি বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থাগুলো এসব এলাকা চিহ্নিত করেছে।
ভোগান্তির আরেক কারণ বিআরটি প্রকল্প
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে চলমান বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে শেষ না হওয়ায় জনদুর্ভোগ বেড়েছে। প্রায় এক যুগ ধরে চলমান এই প্রকল্পের কারণে অনেক স্থানে সড়ক সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে যানজট লেগেই থাকে।
গাজীপুর থেকে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত দ্রুত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালের ডিসেম্বরে এই প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার সড়কে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পের সময়সীমা ছিল চার বছর এক মাস। তবে প্রকল্পের সময়সীমা ইতোমধ্যে পাঁচ দফা বাড়ানো হয়েছে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনও তা সম্পন্ন হয়নি।
জিরানী বাসস্ট্যান্ডেও লেগেই থাকে যানজট
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের চন্দ্রা ত্রিমোড় হয়ে উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলার যানবাহন চলাচল করে। ঈদযাত্রার সময় এই মহাসড়কের কোনাবাড়ী, সফিপুরসহ বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ যানজট দেখা যায়।
বিশেষ করে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের সাত কিলোমিটার এলাকায় গাজীপুর মহানগরীর জিরানী বাসস্ট্যান্ডে প্রায়ই যানজট লেগে থাকে।
চালকদের মতে, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের অনেক অংশ ভাঙাচোরা থাকায় স্বাভাবিক সময়েও এই সড়ক পার হতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। চন্দ্রা এলাকায় যানজট সৃষ্টি হলে তা কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষকে দীর্ঘ সময় দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
চালক ও যাত্রীদের আশঙ্কা
জামালপুরের ভাটিবাংলা পরিবহনের চালক আব্দুল জব্বার বলেন, টঙ্গী থেকে বোর্ড বাজার পর্যন্ত বিআরটি প্রকল্পের কাজ এখনও শেষ হয়নি। ঈদের সময় মানুষের ঢল ও যানবাহনের চাপ বাড়লে প্রকল্প এলাকার সরু সড়কের কারণে যানজট তৈরি হতে পারে।
শ্রীপুরের প্রভাতী-বনশ্রী পরিবহনের চালক রফিকুল ইসলাম জানান, চান্দনা চৌরাস্তায় মহাসড়কের পাশে ময়লার স্তূপ তৈরি হওয়ায় রাস্তা সরু হয়ে গেছে। স্বাভাবিক সময়েই সেখানে যানজট থাকে, ঈদের সময় তা আরও বাড়তে পারে।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া এলাকার যাত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ফুটপাত ও সড়ক দখল করে বাজার বসানো হয়েছে। পাশাপাশি অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচলও যানজটের অন্যতম কারণ।
জামালপুরের ইসলাম পরিবহনের চালক মইজুদ্দিন মিয়া বলেন, মহাসড়কের অনেক জায়গায় বাজার বসানোর কারণে সড়কের অর্ধেক অংশ দখল হয়ে গেছে। ফলে দুই লেনের সড়ক অনেক জায়গায় এক লেনে পরিণত হয়েছে। এতে গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হয়।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে পুলিশের প্রস্তুতি
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার শফির উদ্দিন বলেন, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের মৌচাক থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত এলাকাকে গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এস এম আশরাফুল আলম জানান, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা ও ভোগড়ার পেয়ারাবাগান এলাকায় সবচেয়ে বেশি যানজট হয়।
তিনি বলেন, ঈদের আগেই চান্দনা চৌরাস্তার ঢাকামুখী উড়ালসড়ক চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া মহাসড়কের অবৈধ স্থাপনা, বাজার ও ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এতে ঈদযাত্রায় যানবাহনের চাপ বাড়লেও যানজট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।