মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj

উন্নয়নের চেয়ে মানুষের জীবন গুরুত্বপূর্ণ: ড. কামরুজ্জামান

উন্নয়নের চেয়ে মানুষের জীবন গুরুত্বপূর্ণ: ড. কামরুজ্জামান
ছবি- সংগৃহীত
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

ব্রিজ, ফ্লাইওভার বা মেট্রোর প্রতিশ্রুতি নয়; রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—মানুষ কি নিরাপদে বাঁচতে পারছে কি না। পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার মন্তব্য করেছেন, উন্নয়নের নামে যদি নাগরিক জীবনের মৌলিক নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত অধিকারকে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন আসলে অর্থহীন।

ড. মজুমদার আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতির এখন সময় এসেছে একটি ‘সারভাইভাল ম্যানিফেস্টো’ প্রণয়ন করার। এই ম্যানিফেস্টোতে উন্নয়নের আগে মানুষের জীবন ও পরিবেশের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে নেওয়া হবে। তার মতে, উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং মানুষের নিরাপদ জীবন ও পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।

শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে পরিবেশ, রাজনীতি ও সরকারের ভূমিকা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে ড. কামরুজ্জামান বর্তমান নগর বাস্তবতাকে কঠোর ভাষায় তুলে ধরেন।

রাজধানীর বেইলি রোডের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে সপরিবারে বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি ঢাকা শহরকে একটি ‘মৃত্যুকূপ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তার ভাষায়, রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক পর্যায়ে নাগরিক নিরাপত্তা নিয়ে চরম অবহেলা রয়েছে।

ড. কামরুজ্জামান বলেন, নির্মল বাতাসে শ্বাস নেওয়া মানুষের সাংবিধানিক অধিকার হলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত করার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা যায় না। গণভবনে থাকা মানুষ এবং কড়াইল বস্তিতে বসবাসকারী মানুষ—সবাই একই দূষিত বাতাস গ্রহণ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বৈষম্যহীন দূষণের দায় রাজনীতি এড়িয়ে যেতে পারে না।

তিনি বলেন, আমরা এমন এক শহরে বসবাস করছি যেখানে ফুটপাতে নিরাপদে হাঁটার পরিবেশ নেই। মাথার ওপর ঝুলছে নির্মাণাধীন ভবনের ইট, নিচে রয়েছে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল। এই অনিরাপদ বাস্তবতাকে উন্নয়ন বলা যায় না।

বিগত বিভিন্ন সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করে ড. কামরুজ্জামান বলেন, একাধিক রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এলেও সাধারণ মানুষের নিরাপদ বসতি ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। তিনি ‘অর্নামেন্টাল ডেভলপমেন্ট’ বা শোভাবর্ধক উন্নয়নের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, ফ্লাইওভার ও মেট্রোর ভিড়ে শহরের খোলা জায়গা, শ্বাস নেওয়ার পরিবেশ ও নাগরিক স্বস্তি ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে।

পরিবেশভিত্তিক প্রকল্পে দুর্নীতি বেশি হওয়ার কারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার মতে, পরিবেশ প্রকল্পে নেওয়া ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকে বহন করতে হয়, অথচ সেই প্রকল্পের সুফল তারা পায় না।

আগামী রাজনৈতিক বাস্তবতা সামনে রেখে ড. কামরুজ্জামান একটি ‘গ্রিন ক্লিন ম্যানিফেস্টো’ বা সবুজ ইশতেহারের দাবি জানান। তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের বক্তব্য আবেগনির্ভর নয়, বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে। যে কোনো ব্রিজ বা বড় প্রকল্প নেওয়ার আগে বাধ্যতামূলকভাবে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিশ্চিত করতে হবে।

খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু ক্যান্সার হাসপাতাল বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়। মানুষের জন্য নিরাপদ খাবারের নিশ্চয়তা দিতে না পারলে সেটি ব্যর্থ রাষ্ট্রব্যবস্থারই প্রতিফলন।

ভোটারদের উদ্দেশে ড. কামরুজ্জামান বলেন, যারা ভোট চাইতে আসবেন তাদের কাছে স্পষ্টভাবে পাঁচটি বিষয়ে অঙ্গীকার আদায় করতে হবে—শব্দদূষণমুক্ত এলাকা, যানজট নিরসন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ দূষণ কেবল প্রাকৃতিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি একটি রাজনৈতিক সমস্যা। তাই এর দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করে ড. কামরুজ্জামান বলেন, আগামী যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের প্রধান কমিটমেন্ট হতে হবে একটি ‘সবুজ বাংলাদেশ’ গড়া। পরিবেশগত নিরাপত্তার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার যারা করতে পারবেন, জনগণ শেষ পর্যন্ত তাদেরই সমর্থন দেবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

আরও পড়ুন