সচিবালয়ের নিরাপত্তা জোরদার, ফায়ার সার্ভিসের জন্য আলাদা গেট ও আগুন প্রতিরোধী দরজা বসানো হচ্ছে

বাংলাদেশ সচিবালয়কে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) হিসেবে বিবেচনা করে এর অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে সুপারিশ বাস্তবায়নে তৎপর হয়েছে সরকার। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরামর্শ অনুযায়ী, বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
সচিবালয়ের দেখভালের দায়িত্বে থাকা ইডেন ভবন গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যেন নির্বিঘ্নে সচিবালয়ের যেকোনো ভবনের পাশে গিয়ে আগুন নেভাতে পারে, সেজন্য ভবনগুলোর মধ্যে থাকা সব সংযোগ সেতু (Concord Bridge) ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
এছাড়া, অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে পুরনো সব ভবনের প্রত্যেক ফ্লোরে বসানো হচ্ছে আগুন প্রতিরোধী বিশেষ দরজা। ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি দ্রুত প্রবেশের সুবিধার্থে সচিবালয়ে একটি আলাদা প্রবেশ গেটও তৈরি করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলোর মাধ্যমে সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দিনগত রাতে সচিবালয়ে সবচেয়ে বড় আগুন লাগার ঘটনা ঘটে। এতে পুড়ে যায় ৭ নম্বর ভবনের চারটি তলা। ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর পরের দিন সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। আগুন পুরোপুরি নিভিয়ে ফেলতে সময় লাগে প্রায় ১০ ঘণ্টা।
তখন এ আগুনের ঘটনা তদন্তে ২৬ ডিসেম্বর রাতে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি ছিলেন আট সদস্যের এ কমিটির আহ্বায়ক। এ কমিটি অগ্নিকাণ্ডের কারণ, বর্তমান অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবেচনায় ভবিষ্যতে সচিবালয়ে এ ধরনের অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ দেয়।
সচিবালয়ে ভাঙা হচ্ছে সংযোগ সেতু, বসবে আগুন প্রতিরোধী দরজা
ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাতে নির্বিঘ্নে সচিবালয়ের যে কোনো ভবনের পাশে গিয়ে আগুন নেভাতে পারে, সেজন্য সব সংযোগ সেতু ভেঙে ফেলা হচ্ছে, ছবি: জাগো নিউজ
কমিটি স্বল্প সময়ের মধ্যে (এক থেকে ছয় মাস) বাস্তবায়নযোগ্য ১২টি, মধ্যম মেয়াদে (ছয় থেকে ১২ মাস) বাস্তবায়নযোগ্য পাঁচটি, দীর্ঘমেয়াদে (১২ মাসের বেশি) বাস্তবায়নযোগ্য ১০টি এবং সচিবালয়ের নিরাপত্তা সংক্রান্ত আটটি সুপারিশ দেয়। তবে সেসব সুপারিশ বাস্তবায়নে খুব একটা উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সচিবালয়ের অগ্নিনিরাপত্তায় এর আগে আওয়ামী লীগের সময়ও ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সময়ে গঠিত তদন্ত কমিটি বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ করলেও সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর মধ্যে গত ১৮ অক্টোবর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে বড় অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তাতে আমদানির কার্গো কমপ্লেক্স পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর নড়েচড়ে বসে সরকার। সব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে তৎপরতা শুরু হয়।
নতুন দুটি ভবনসহ সচিবালয়ে এখন মোট ১৩টি ভবন রয়েছে। ৯ নম্বর (স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভবন), ডে-কেয়ার এবং অভ্যর্থনা অংশের ভবন ছাড়া সবগুলো ভবনেই যাতায়াতের জন্য সংযোগ সেতু রয়েছে। এ সেতুগুলো নিচু হওয়ায় সচিবালয়ের ভেতরে আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের উঁচু মইবাহী গাড়ি বা টার্ন টেবল লেডার (টিটিএল) চলাচল করতে পারত না। দূর থেকে আগুন নেভানোর চেষ্টা করা হতো। তাই সংযোগ সেতুগুলো ভেঙে ফেলার জন্য ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ জানানো হচ্ছিল।
এর মধ্যে সচিবালয়ের অগ্নিনিরাপত্তায় বাধা সংযোগ সেতুগুলো ভেঙে ফেলা শুরু করেছে গণপূর্ত বিভাগ।
ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি যাতে নির্বিঘ্নে সচিবালয়ের যে কোনো ভবনের পাশে গিয়ে আগুন নেভাতে পারে, সেজন্য সব সংযোগ সেতু ভেঙে ফেলা হচ্ছে ।
বুধবার (৩ ডিসেম্বর) সরেজমিনে দেখা গেছে, ৫ নম্বর ভবন থেকে ৬ নম্বর ভবনে যাওয়ার এবং ৬ নম্বর ভবন থেকে ৭ নম্বর ভবনে যাওয়ার সংযোগ সেতুর একাংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সচিবালয় অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ সরকারি দপ্তর। খুবই অল্প জায়গায় অনেক সংখ্যক মানুষ এখানে কাজ করেন। এখানে প্রায়ই ছোটোখাটো আগুনের ঘটনা ঘটে। আগে বেশির ভাগ ভবন নির্মাণের সময় অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তাই এখানকার অগ্নিঝুঁকি নিরূপণের পর করণীয় বিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে একাধিকবার কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করে নতুন ১১ নম্বর (অর্থ মন্ত্রণালয়) ও ১ নম্বর (মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়) ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পুরোনো ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় (কেপিআই) অগ্নিদুর্ঘটনা প্রতিরোধে একটি বিশেষ প্রকল্প একনেকে উঠছে বলেও জানিয়েছেন গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীরা।