নিজের মতো বাঁচতে একা ভ্রমণের পথে নারীরা

বয়স বাড়ার সঙ্গে ভ্রমণের ইচ্ছা কমে যায়—এমন ধারণা এখন অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে ৫০, ৬০ কিংবা ৭০ পেরোনো নারীদের মধ্যে একা ভ্রমণের প্রবণতা বাড়ছে। তাঁদের কাছে একক ভ্রমণ শুধু নতুন কোনো স্থান দেখার সুযোগ নয়; বরং নিজের স্বাধীনতা ফিরে পাওয়া, জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু করা এবং নিজের ইচ্ছাকে গুরুত্ব দেওয়ার একটি মাধ্যম।
‘গার্লস গাইড টু দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর সাম্প্রতিক এক জরিপ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণ বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বয়সী নারী ভ্রমণকারীরা ভ্রমণের ক্ষেত্রে প্রচলিত বিলাসিতার চেয়ে অর্থবহ অভিজ্ঞতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। স্থানীয় সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপন, ঐতিহ্যবাহী খাবার ও প্রকৃতির কাছাকাছি যাওয়ার অভিজ্ঞতাই তাঁদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়।
জীবনের পরিবর্তন থেকে ভ্রমণের নতুন শুরু
সন্তানদের বড় হয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া, অবসর গ্রহণ, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা প্রিয়জনকে হারানোর মতো জীবনের নানা পরিবর্তন অনেক নারীকে নতুনভাবে নিজের জীবন নিয়ে ভাবার সুযোগ করে দেয়। এই পর্যায়ে এসে অনেকে অন্য কারও সময় বা সঙ্গের ওপর নির্ভর না করে নিজের পছন্দ অনুযায়ী ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ছেন।
দীর্ঘদিন চাকরি ও পরিবার সামলানোর পর এই নারীদের অনেকেই মনে করেন, নিজের জন্য সময় দেওয়ার সুযোগ আর হাতছাড়া করা উচিত নয়। তাঁদের কাছে বয়স কোনো বাধা নয়; বরং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের আরেকটি সুযোগ।
বিলাসিতার চেয়ে অভিজ্ঞতাই গুরুত্বপূর্ণ
বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ভ্রমণকারীদের কাছে দামি হোটেল, বিলাসবহুল বাথটাব কিংবা ফার্স্ট ক্লাসের চেয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও নিরিবিলি থাকার জায়গা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জরিপে ৪৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, দলবদ্ধভাবে ভ্রমণ করলেও তাঁরা নিজেদের জন্য আলাদা কক্ষ পছন্দ করেন।
অনেকে একটি বিশেষ ভ্রমণের জন্য বাড়তি অর্থ খরচ করতেও প্রস্তুত। তবে সেই ব্যয়ের বিনিময়ে তাঁরা চান স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে জানার সুযোগ। অভিজ্ঞ গাইড, স্থানীয় খাবার এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তাঁদের কাছে ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ।
একা গেলেও সঙ্গ পছন্দ সমমনা নারীদের
একক ভ্রমণ মানেই পুরোপুরি একা থাকা নয়। বরং অনেক নারী সমমনা অন্য নারীদের সঙ্গে ছোট গ্রুপে ভ্রমণ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। জরিপে ৪৮ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, তাঁরা ইতিমধ্যে শুধু নারীদের নিয়ে গঠিত কোনো ট্যুর গ্রুপে ভ্রমণ করেছেন।
এ ধরনের ভ্রমণ একদিকে যেমন নিরাপত্তার অনুভূতি বাড়ায়, অন্যদিকে নতুন বন্ধুত্ব তৈরির সুযোগও করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে ভ্রমণ শেষ হওয়ার পরও এসব সম্পর্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকে।
অ্যাডভেঞ্চারেও পিছিয়ে নেই
বয়োজ্যেষ্ঠ নারীরা শুধু জাদুঘর বা দর্শনীয় স্থানে ঘুরে বেড়াতেই আগ্রহী—এমন ধারণাও বদলে যাচ্ছে। অনেকেই হাইকিং, দীর্ঘ পথ হাঁটা কিংবা বাইক রাইডের মতো অ্যাডভেঞ্চার বেছে নিচ্ছেন।
ইংল্যান্ডের কটসওয়ার্ল্ডস, কানাডিয়ান রকিজ কিংবা স্পেনের প্রায় ৮০৪ কিলোমিটার দীর্ঘ কামিনো ফ্রান্সেসের মতো দীর্ঘ হাঁটার পথেও তাঁদের দেখা যাচ্ছে। এমনকি ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে ৮০৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেওয়ার দৃষ্টান্তও রয়েছে।
পর্যটক নয়, সংস্কৃতির অংশ হতে চান
জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে গিয়ে ছবি তুলে ফিরে আসার বদলে এই বয়সী নারীরা স্থানীয় সংস্কৃতিকে কাছ থেকে অনুভব করতে চান। ইতালির টাস্কানিতে মৃৎশিল্প তৈরি, ফ্রান্সে আর্ট রেসিডেন্সিতে অংশ নেওয়া, গ্রিসের ক্রিটে পাহাড়ি জীবনের অভিজ্ঞতা নেওয়া কিংবা মরক্কোর স্থানীয় নারীদের কাছ থেকে রুটি বানানো ও কাপড় বোনা শেখার মতো কার্যক্রম তাঁদের আকর্ষণ করছে।
অর্থাৎ তাঁদের ভ্রমণের মূল লক্ষ্য শুধু কোনো জায়গা দেখা নয়; বরং সেই জায়গার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়া।
বদলে যাচ্ছে প্রচলিত ধারণা
বয়োজ্যেষ্ঠ নারী ভ্রমণকারীদের নিয়ে প্রচলিত অনেক ধারণাও ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। তাঁরা ভীতু, প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে কিংবা শুধু শান্ত পরিবেশ পছন্দ করেন—এমন ধারণার সঙ্গে বাস্তবতার অনেকটাই পার্থক্য রয়েছে।
অনেক নারী প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ, নিজের ভ্রমণ নিজেই পরিকল্পনা করতে সক্ষম এবং নতুন অভিজ্ঞতা গ্রহণে যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী। দীর্ঘ কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পর তাঁদের অনেকেরই এখন নিজের পছন্দ অনুযায়ী সময় ও অর্থ ব্যয়ের সুযোগ রয়েছে।
বয়স নয়, ইচ্ছাই বড়
৫০ পেরোনো নারীদের একক ভ্রমণের এই প্রবণতা দেখিয়ে দিচ্ছে, জীবনের নতুন কিছু শুরু করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বয়স নেই। দীর্ঘদিন অন্যদের দায়িত্ব পালনের পর নিজের জন্য সময় বের করে নেওয়া, নতুন জায়গা দেখা এবং নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া তাঁদের কাছে হয়ে উঠছে আত্মবিশ্বাস ও স্বাধীনতার প্রকাশ।
তাই একক ভ্রমণ এখন শুধু তরুণদের বিষয় নয়। বরং জীবনের পরিণত পর্যায়েও পৃথিবীকে নতুন করে আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষা সমান শক্তিশালী—আর সেই পথেই এগিয়ে চলেছেন অসংখ্য নারী।