দেশজুড়ে অগ্নিকাণ্ড: দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র?

গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া একের পর এক অগ্নিকাণ্ড সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। রাজধানীর মিরপুরে কেমিক্যাল গোডাউনে আগুনে অন্তত ১৬ জনের মৃত্যু, চট্টগ্রামের ইপিজেডে পোশাক কারখানায় ব্যাপক ক্ষতি এবং সর্বশেষ শনিবার (১৮ অক্টোবর) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড—এসব ঘটনায় শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও বড় প্রশ্ন উঠেছে।
সাধারণ মানুষ থেকে উদ্যোক্তা ও রাজনীতিক—সবাই প্রশ্ন তুলছেন, এসব অগ্নিকাণ্ড কি নিছক দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে কোনো পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র রয়েছে?
গত ১৪ অক্টোবর দুপুর পৌনে ১২টার দিকে মিরপুর শিয়ালবাড়ির কেমিক্যাল গোডাউনে লাগা আগুনে অন্তত ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ভবনের ছাদ টিনশেড ও তালাবদ্ধ থাকার কারণে লোকজন বের হতে পারেনি। গুদামে হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড, ব্লিচিং পাউডারসহ সাত–আট ধরনের রাসায়নিক দ্রব্য মজুত ছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিস্ফোরণের পর নিচের গ্যাস সিলিন্ডারও বিস্ফোরিত হয়, যা আগুনের তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
চট্টগ্রামের রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ (সিইপিজেড) এলাকার ‘অ্যাডামস ক্যাপ’ কারখানায় আগুন লাগে গত ১৬ অক্টোবর দুপুর ২টার দিকে। আট তলা কারখানার নিচের দুটি তলায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এখানে হাসপাতালের যন্ত্রপাতি ও তোয়ালে তৈরি করা হতো। প্রচুর পরিমাণে দাহ্য পদার্থ থাকায় আগুন দ্রুত ছড়ায় এবং রাতভর জ্বলতে জ্বলতে ভবনের টপ ফ্লোরের ছাদ ধসে পড়ে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অগ্নিকাণ্ড ঘটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে। গত ১৮ অক্টোবর দুপুরে বিমানবন্দরের ৮ নম্বর গেটের কার্গো সেকশনে আগুন লাগে। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় সাময়িকভাবে সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করা হয়েছিল।
অগ্নিকাণ্ডের এই খবর ফলাও করে প্রকাশ হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে; যা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ব্যবসায়ীদের মধ্যেও।
‘বিপুল ক্ষতি’, ‘ষড়যন্ত্রের’ গন্ধ
পরপর ঘটে যাওয়া এই অগ্নিকাণ্ডগুলো কেবল ধ্বংসই নয়, দেশের ব্যবসা খাত ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মিরপুরের কেমিক্যাল গোডাউন, চট্টগ্রামের পোশাক কারখানা ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-প্রত্যেকটিরই ঘটনা নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ ত্রুটি এবং সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রের দিকগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, শুধু দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনাকেও অবহেলা করা যায় না।
বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের কারণে প্রাথমিকভাবে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি নিছক দুর্ঘটনা নাও হতে পারে। কারণ, কার্গো সেকশনটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। এখানে কাস্টমসের জব্দ পণ্য, আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের দলিলপত্র, ওষুধশিল্প ও কৃষিপণ্যের কাঁচামাল সংরক্ষিত থাকে।
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএইএবি) সভাপতি কবির আহমেদ জানিয়েছেন, ‘বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। এয়ার এক্সপ্রেস ইউনিট পুরোপুরি পুড়ে গেছে।’
দেশের ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ’স্কাইবাই বিডি’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাসেল বিন আহাদ বলেন, বিমানবন্দর কার্গো শেডে আগুনে স্কাইবাই বিডির দুই কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। এটি শুধু প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, হাজার হাজার গ্রাহকের জন্যও ক্ষতি।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘কার্গো ভিলেজের ভেতরের লোক ও বাইরের চক্র মেলবন্ধনে এই ঘটনা ঘটিয়েছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সেখানে অনেক পণ্য চুরি হয় এবং ধামাচাপা দেয়ার জন্যই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটানো হয়েছে কিনা, সেটি তদন্ত করা প্রয়োজন। এত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কাজ করা সিভিল এভিয়েশনের চেয়ারম্যানসহ প্রত্যেককেই দায়িত্ব নিতে হবে। পানির পাইপ নষ্ট, ফায়ার ফাইটিং কার্যকর নয়- এভাবে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে?’
ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর টিআইএম নুরুল কবির বলেন, ‘শাহজালাল বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা আমদানি-রফতানিতে বড় প্রভাব ফেলবে। আন্তর্জাতিকভাবে ফায়ার সেফটির অব্যবস্থাপনা দেশের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।’
শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা
বিকেএমইএ ও এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গত কয়েকদিনে স্থানীয় ও রফতানিমুখী একাধিক পোশাক কারখানায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এ ধরনের ঘটনা আমাদের উদ্যোক্তাদের মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতি বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে। কারণ কার্গো ভিলেজের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর জায়গায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে যে এটি কতটা অনিরাপদ।
তিনি আরও বলেন, কয়েক বছর ধরেই আমরা রফতানিকারকেরা অভিযোগ করে আসছি, আমাদের পণ্য খোলা জায়গায় রাখা হয়; যা নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ। এই ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নাকি এর পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত শুরু করা উচিত।
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন বলছে, এই দুর্ঘটনা পরিকল্পিতভাবে দেশের শিল্প কারখানা, আমদানি-রফতানি খাত এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে ক্ষতিগ্রস্ত করে জাতীয় অর্থনীতিকে অচল করার একটি নীল নকশার অংশ হতে পারে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত করে দায়ীদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনতে হবে।
রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগ
বিভিন্ন জায়গায় আগুন লাগাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখছেন না জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) উত্তরাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। শাহজালালে আগুন লাগার পর ফেসবুকে তিনি অভিযোগ করেন, ‘এগুলো স্বৈরাচারের দোসরদের দেশকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্তের অংশ। তথাকথিত তদন্ত কমিটির নাটক বাদ দিয়ে এর পেছনের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা হোক।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।’ দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘মিরপুর ও চট্টগ্রামের অগ্নিকাণ্ডের পর বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড কী আকস্মিক দুর্ঘটনা নাকি নাশকতা, এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। বিমানবন্দরের মতো কৌশলগত স্থাপনায় এই ঘটনা প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, অবহেলা ও নিরাপত্তা ঘাটতির প্রমাণ। যদি কোনো গাফিলতি বা নাশকতার উপাদান থাকে, তা দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে তদন্ত করতে হবে। দোষীদের আইনের আওতায় আনা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া সময়ের দাবি। ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে, তার জন্য সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’
এদিকে, এক বিবৃতিতে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানিয়েছে, ‘দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি সংঘটিত একাধিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় জনমনে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার তা গভীরভাবে অবগত। আমরা সব নাগরিককে আশ্বস্ত করতে চাই-নিরাপত্তা সংস্থাগুলো প্রতিটি ঘটনা গভীরভাবে তদন্ত করছে এবং মানুষের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে। নাশকতা বা অগ্নিসংযোগের কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার তাৎক্ষণিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে।’
অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। আহ্বায়ক হিসেবে নিযুক্ত আছেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান পাটওয়ারী। কমিটির কাজ হলো অগ্নিকাণ্ডে সৃষ্ট সার্বিক ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত নিরূপণ করে সরকারের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা।
সংকটে দেশের ইমেজ, শঙ্কায় বিনিয়োগ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আগুনে অনেক পণ্য পুড়ে গেছে। হয়তো বিমা কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে কিছু টাকা পাওয়া যাবে, কিন্তু যে ইমেজ সংকট তৈরি হচ্ছে সেটি পূরণ করতে অনেক সময় লেগে যাবে। এর প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্যে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির সময় সংবাদকে বলেন, শাহজালালের কার্গো ভিলেজে আগুনের ক্ষয়ক্ষতি এখনো সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি, তবে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে ক্ষতির পরিমাণ বিপুল। এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবন কাঠামোর ওপরও বড় আঘাত হেনেছে। এরই মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরগুলোতে দেখা যাচ্ছে-বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দরে ভয়াবহ আগুনে মূল্যবান পণ্য পুড়ে গেছে এবং দীর্ঘ সময়েও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। এই ঘটনায় দেশের ইমেজে বড় সংকট তৈরি হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ী ভবিষ্যতে হয়তো এই কার্গো সুবিধা ব্যবহার করে পণ্য পাঠাতে অনীহা প্রকাশ করবেন।
তিনি মনে করেন, এর প্রভাব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেনেও পড়তে পারে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ধরনের ঘটনার ফলে ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমে যেতে পারে।
ড. মাহফুজ কবির আরও বলেন, এটি নিছক একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং দেশের প্রশাসনিক সক্ষমতা ও সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতির এক বড় পরীক্ষা।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডগুলোকে শুধু দুর্ঘটনা হিসেবে না দেখে নাশকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও তদন্ত করা জরুরি। কারণ মিরপুরের অগ্নিকাণ্ডে কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে আগুন লেগে থাকতে পারে, তবে চট্টগ্রাম ইপিজেড ও শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ডে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি পর্যাপ্ত ছিল কি না তা সন্দেহজনক।
ড. তৌহিদুল হক সময় সংবাদকে বলেন, বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আগুন লাগলে আন্তর্জাতিকভাবে দেশের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়; বিদেশি বিনিয়োগকারী ও কূটনীতিকদের মধ্যে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়।
সংশ্লিষ্ট ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
’স্কাইবাই বিডি’র প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও রাসেল বিন আহাদ বলেন, পণ্য দেশে প্রবেশের পর সব প্রকার শুল্ক ও কর পরিশোধ সত্ত্বেও পণ্যটি সর্বশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের গোডাউনে থাকাকালীন ধ্বংস হয়েছে; তাই পরিশোধিত সম্পূর্ণ ট্যাক্স ফেরত দিতে হবে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ত্রুটির কারণে সংঘটিত এই বিপুল ক্ষতির দায় স্বীকার করে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবির বলেন, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজে শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা জরুরি। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান এবং জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিকভাবে অগ্নিকাণ্ড ও ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কাজ করছে- তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো উচিত। বাস্তবভিত্তিক ও নির্ভুলভাবে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পেতে হলে অবশ্যই এই বিশেষজ্ঞদের সম্পৃক্ত করা দরকার।
একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আর না ঘটে, সে জন্য বিমানবন্দর, বাণিজ্যিক এলাকা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদারের তাদিগ দেন তিনি। তবে এই ঘটনাকে যেন রাজনৈতিক বা বিদেশি প্রভাবের কারণে স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত না করা হয়; বরং গুজব রোধে দ্রুত সঠিক তথ্য প্রকাশ করার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে জনগণের আস্থা অটুট থাকে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়।
সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক বলেন, যদি সত্যিই এটি নাশকতা হয়, তবে এর পেছনে কারা রয়েছে, তাদের উদ্দেশ্য কী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউ এতে জড়িত কিনা-তা খুঁজে বের করা জরুরি। যদি তদন্তে বিলম্ব হয়, তাহলে নাশকতাকারীরা আরও সুযোগ পাবে এবং এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা অব্যাহত থাকতে পারে। দুর্ঘটনা হলে তা সাধারণত সীমিত পরিসরে ঘটে, কিন্তু নাশকতার ক্ষেত্রে পরপর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে আগুন লাগার ঝুঁকি থেকে যায়।
তবে তদন্তের ক্ষেত্রে কোনো নিরীহ ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সদস্যকে অন্যায়ভাবে দোষারোপ না করার পরামর্শ দেন তিনি। ড. হক মনে করেন, সঠিক ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত অভিযুক্তদের শনাক্ত করা সম্ভব, যা ভবিষ্যতে এ ধরনের অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে সহায়তা করবে।
ফায়ার ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মেজর এ. কে. এম. শাকিল নেওয়াজ (অব.) সময় সংবাদকে বলেন, প্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা না থাকা ও সতর্কতার অভাবে বেশিরভাগ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তবে বিমানবন্দরে ফায়ার ফাইটিং সিস্টেম কার্যকর না থাকায় আগুন নেভাতে দীর্ঘ সময় লেগেছে। যার ফলে বড় আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে যে ছিল, তাকে সর্বপ্রথম জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
ভবিষ্যতে এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানো পাশাপাশি সংগঠন বা প্রতিষ্ঠানগুলো নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদারের পরামর্শ দেন তিনি। শাকিল নেওয়াজ মনে করেন, শুধু ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই হবে না; নিজ প্রতিষ্ঠানও কতটা অগ্নিঝুঁকি রোধ করতে পেরেছে, সেটিও দেখতে হবে।