তুলাবহির্ভূত পোশাকে বিশ্ব এগোলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ

বিশ্বের পোশাকবাজারে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। তুলানির্ভর পোশাকের পাশাপাশি কৃত্রিম, মিশ্র ও অন্যান্য বিশেষায়িত তন্তুর পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। খেলাধুলা ও সক্রিয় জীবনযাপনের পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর কাপড়, বিশেষ ধরনের শীতবস্ত্রসহ উচ্চমূল্যের পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না বাংলাদেশের পোশাকশিল্প।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) এক পর্যালোচনায় এ চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্ব পোশাক রফতানিতে তুলার অংশ ছিল ৪৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশে। বিপরীতে তুলাবহির্ভূত কৃত্রিম ও অন্যান্য তন্তুনির্ভর পোশাকের অংশ ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ হয়েছে।
বাংলাদেশের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২১ সালে দেশের পোশাক রফতানিতে তুলার অংশ ছিল ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা সামান্য কমে ৭২ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে তুলাবহির্ভূত পোশাকের অংশ ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
অর্থাৎ পাঁচ বছরে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে তুলাবহির্ভূত পণ্যের অংশ বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশীয় পয়েন্ট। অন্যদিকে বিশ্ববাজারে একই ধরনের পোশাকের অংশ বেড়েছে ৩ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট।
বিশ্ববাজারের সঙ্গে বাড়ছে ব্যবধান
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালে বিশ্ব পোশাক রফতানিতে তুলাবহির্ভূত পণ্যের অংশ ছিল ৫৫ দশমিক ১ শতাংশ। বাংলাদেশে এ হার ছিল ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যবধান ছিল প্রায় ২৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।
২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে তুলাবহির্ভূত পোশাকের অংশ বেড়ে ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে তা ২৭ দশমিক ৩ শতাংশে সীমাবদ্ধ। ফলে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ শতাংশীয় পয়েন্টে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনও মূলত তুলানির্ভর পণ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অথচ বিশ্ববাজারের চাহিদা দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং উচ্চমূল্যের অনেক পণ্যে কৃত্রিম ও বিশেষায়িত তন্তুর ব্যবহার বাড়ছে।
তার মতে, শুধু কম দামে পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা দিয়ে ভবিষ্যতের বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে। পণ্যের বৈচিত্র্য এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে।
বেশি মূল্য সংযোজনের পণ্যে সুযোগ
তুলাবহির্ভূত পোশাকের মধ্যে খেলাধুলার পোশাক, সক্রিয় জীবনযাপনের উপযোগী পোশাক, পানি ও বাতাস প্রতিরোধী পোশাক, বিশেষ ধরনের শীতবস্ত্র এবং কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত সুরক্ষামূলক পোশাক রয়েছে। এসব পণ্য উৎপাদনে উন্নত কাঁচামাল, প্রযুক্তি, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়।
বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলো সাধারণ পোশাকের পাশাপাশি এসব উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে বেশি ঝুঁকছে। ফলে এই খাতে বাংলাদেশের জন্য মূল্য সংযোজন ও রফতানি বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের রয়েছে বড় উৎপাদন সক্ষমতা, তুলনামূলক কম শ্রম ব্যয় এবং দীর্ঘদিনের রফতানি অভিজ্ঞতা। তবে কাঁচামাল, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও বিশেষায়িত উৎপাদনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দেশের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রতিযোগী দেশগুলো এগিয়ে
এশিয়ার কয়েকটি পোশাক রফতানিকারক দেশ ইতোমধ্যে কৃত্রিম ও মিশ্র তন্তুনির্ভর পোশাক উৎপাদনে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। ভিয়েতনাম ও চীনের পোশাক রফতানিতে কৃত্রিম তন্তুর পণ্যের অংশ প্রায় ৪৯ শতাংশের কাছাকাছি। কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়াও এ খাতে ৪০ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের তুলাবহির্ভূত পোশাকের অংশ ২৭ শতাংশের কিছু বেশি। ফলে ভবিষ্যতের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগিদ
পোশাক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, কৃত্রিম ও মিশ্র তন্তুর কাঁচামাল, বিশেষায়িত সুতা ও কাপড়, রং ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তি, আধুনিক গবেষণাগার এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য তন্তুর ব্যবহারেও গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ ভবিষ্যতের পোশাকবাজারে শুধু কৃত্রিম তন্তুর ব্যবহার নয়, টেকসই ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের চাহিদাও বাড়ছে। এ খাতে এখন বিনিয়োগ করা গেলে বাংলাদেশ নতুন বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারে।
পাঁচ বছরে সামান্য পরিবর্তন
২০২১ সালে বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে তুলার অংশ ছিল ৭৩ দশমিক ২ শতাংশ। ২০২২ সালে তা বেড়ে ৭৩ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৩ সালে ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশে ওঠে। ২০২৪ সালে কমে দাঁড়ায় ৭৩ দশমিক ৪ শতাংশে। ২০২৫ সালে তা আরও কমে ৭২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
বিপরীতে তুলাবহির্ভূত পোশাকের অংশ ২০২১ সালের ২৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ বছরে পরিবর্তন হয়েছে খুব সামান্য।
বিশ্ববাজারের এই পরিবর্তন বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সামনে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। কম শ্রম ব্যয়ের সুবিধার পাশাপাশি এখন প্রযুক্তি, পণ্যের বৈচিত্র্য, দক্ষতা ও মূল্য সংযোজনের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে বাংলাদেশ কত দ্রুত এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।