যে হত্যাকাণ্ডে কেঁপে উঠেছিল হংকং, অ্যাবি চইয়ের সেই মামলার বিচার শুরু

ফ্যাশন, আলো আর বিলাসবহুল জীবনের ঝলমলে জগতে পরিচিত মুখ ছিলেন অ্যাবি চই। হংকংয়ের শোবিজ ও ব্যবসায়ী মহলের পরিচিত এই মডেল ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারের জীবন হঠাৎ থেমে যায় এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডে। ২০২৩ সালে তার নিখোঁজ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার কয়েক দিন পর একটি গ্রামের বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহের কিছু অংশ। সেই ঘটনা শুধু হংকং নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
প্রায় তিন বছর পর সেই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়েছে। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন অ্যাবি চইয়ের সাবেক স্বামী অ্যালেক্স কুয়ং, তার ভাই অ্যান্থনি কুয়ং এবং তাদের বাবা কুয়ং কাউ, যিনি একসময় পুলিশ কর্মকর্তা ছিলেন।
তিনজনের বিরুদ্ধে অ্যাবি চইকে হত্যার পাশাপাশি তার মরদেহের আইনগত দাফন ঠেকানোর অভিযোগ আনা হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়া অন্তত ৪৫ দিন চলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিখোঁজের পর মিলল মরদেহের অংশ
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চার সন্তানের মা অ্যাবি চই ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজ হন। তার চার সন্তানের মধ্যে দুজন ছিলেন সাবেক স্বামী অ্যালেক্স কুয়ংয়ের সন্তান।
নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর হংকংয়ের তাই পো এলাকার একটি গ্রামের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তার মরদেহের কিছু অংশ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে একটি মাংস কাটার যন্ত্র, বৈদ্যুতিক করাত ও কিছু পোশাকও উদ্ধার করা হয়।
এরপর তদন্তের পরিধি আরও বাড়ে। সম্ভাব্য আলামত খুঁজতে পুলিশ একটি ল্যান্ডফিলেও তল্লাশি চালায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত সুরক্ষা পোশাক পরে কর্মকর্তারা বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের স্তূপে প্রমাণ খুঁজেছেন—হত্যাকাণ্ডটির ভয়াবহতার একটি চিত্র তখনই সামনে আসে।
তিন আসামির বিচার
মরদেহের অংশ উদ্ধারের পর অ্যাবি চইয়ের সাবেক স্বামী অ্যালেক্স কুয়ং, তার ভাই অ্যান্থনি কুয়ং এবং তাদের বাবা কুয়ং কাউকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
হংকংয়ের বিচারব্যবস্থা মূল ভূখণ্ড চীনের চেয়ে ভিন্ন। সেখানে কমন ল’ ব্যবস্থা চালু থাকায় মামলার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জুরির মাধ্যমে হবে। তিন আসামি হত্যার অভিযোগে দোষী কি না, তা জুরি সদস্যরাই নির্ধারণ করবেন।
হংকংয়ে হত্যার অপরাধে বাধ্যতামূলক যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
কেন এত দেরিতে বিচার?
সাধারণত হংকংয়ে কোনো হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের প্রায় এক বছরের মধ্যে বিচার শুরু হয়। কিন্তু অ্যাবি চই হত্যা মামলায় ফরেনসিক পরীক্ষার বিপুল পরিমাণ কাজ থাকায় বিচার শুরু হতে বেশি সময় লেগেছে বলে প্রসিকিউটররা আদালতকে জানিয়েছিলেন।
বিচারে অ্যাবি চইকে হত্যার পেছনে কী কারণ ছিল বলে প্রসিকিউশন মনে করছে, সে বিষয়েও আগে প্রকাশ্যে না আসা তথ্য সামনে আসতে পারে। তবে আসামিরা নিজেদের পক্ষে আদালতে সাক্ষ্য দেবেন কি না, নাকি নীরব থাকার অধিকার প্রয়োগ করবেন—তা এখনো পরিষ্কার নয়।
জুরিদের সিদ্ধান্তেই নির্ধারিত হবে পরিণতি
মামলার শুনানি শেষে বিচারক জুরিদের আইনি নির্দেশনা দেবেন। এরপর জুরিদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে নেওয়া হবে এবং তাদের একটি আলাদা কক্ষে পাঠানো হবে রায় নিয়ে আলোচনা করতে।
রায় না দেওয়া পর্যন্ত তারা বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন না। তাদের আলোচনাও গোপন রাখতে হবে।
ঝলমলে জীবন থেকে মর্মান্তিক পরিণতি
অ্যাবি চইয়ের জীবন ছিল ফ্যাশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোয় ভরা। লন্ডন, প্যারিস ও সাংহাইয়ের মতো শহরে বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাকে দেখা গেছে। মৃত্যুর আগে তিনি এলি সাবের স্প্রিং-সামার ২০২৩ হাই কুতুর শোতে অংশ নেন, প্যারিস ফ্যাশন উইকে যান এবং বিলাসবহুল ম্যাগাজিন ‘ল’অফিসিয়েল মোনাকো’র ডিজিটাল কভার মডেল হন।
তবে ফ্যাশনের বাইরেও প্রাণীকল্যাণে কাজ করতেন অ্যাবি। বন্ধুদের ভাষ্য অনুযায়ী, আহত বিড়াল ও কুকুর উদ্ধারে স্বেচ্ছাসেবীদের সঙ্গে মিলে তিনি একটি দাতব্য সংগঠনও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তার মৃত্যুর পর আয়োজিত শেষকৃত্যে শত শত বন্ধু, স্বজন ও স্থানীয় পরিচিত ব্যক্তিত্ব অংশ নেন। সেখানে তাকে ‘মহৎ ও হৃদয়বান’ মানুষ হিসেবে স্মরণ করা হয়।
একসময় যে নারীকে হংকংয়ের ঝলমলে ফ্যাশনজগতের আলোয় দেখা যেত, তার জীবন শেষ হয়েছিল একটি গ্রামের বাড়িতে পাওয়া মরদেহের অংশের মধ্য দিয়ে। এখন সেই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচারেই নির্ধারিত হবে তিন আসামির আইনি পরিণতি।
তথ্যসূত্র: সিএনএন