সৌদিতে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড: গ্রেপ্তার, বিচার ও দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সৌদি আরবে বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ, গ্রেপ্তার, বিচারপ্রক্রিয়া এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ দূতাবাস ও পরিবারকে না জানানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বিদেশে নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে এসব প্রশ্ন তুলে ধরেছেন ব্র্যাকের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান। তিনি নজরুলের পারিবারিক ও কর্মজীবনের তথ্য তুলে ধরে ঘটনাটিকে শুধু একটি পরিবারের শোকের ঘটনা নয়, বরং প্রবাসীদের অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলতার প্রশ্ন হিসেবে দেখেছেন।
শরিফুল হাসান লেখেন, নজরুলের পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনেরা তাঁকে বিনয়ী ও ভদ্র স্বভাবের মানুষ হিসেবে জানতেন। তাঁদের দাবি, সৌদি আরবে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সঙ্গে নজরুলের পরিচিত আচরণের মিল নেই। তবে এসব বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা বা অসত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ঋণ করে সৌদি আরবে পাঠিয়েছিল পরিবার
পোস্টে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নজরুল ২০২০ সালে স্থানীয় একটি মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার একটি কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় ঋণ করে তাঁকে ২০২২ সালের শেষ দিকে সৌদি আরবে পাঠানো হয়।
নজরুলের পাসপোর্ট তৈরি হয় ২০২২ সালের ২১ আগস্ট। একই বছরের ২৪ অক্টোবর তিনি সৌদি আরবে যাওয়ার সরকারি ছাড়পত্র বা স্মার্ট কার্ড পান। মুসা ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি আরবে গিয়ে মজল আল আরবি নামের একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর মাসিক বেতন ছিল ৮০০ সৌদি রিয়াল।
নজরুলের দুই চাচাতো ভাই মোস্তাকিম ভূঁইয়া ও ইমাম হাসান ভূঁইয়ার বরাতে শরিফুল হাসান জানান, কর্মস্থলে এক ব্যক্তির সঙ্গে নজরুলের বিরোধ হয়েছিল। বিষয়টি তিনি ফোনে বাবা-মাকে জানিয়েছিলেন। ওই ব্যক্তি পাকিস্তানের নাগরিক বলে নজরুল তাঁর স্বজনদের জানিয়েছিলেন বলে তাঁদের দাবি। স্বজনদের ধারণা, ওই বিরোধের জেরেই নজরুল ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। তবে এ দাবির পক্ষে স্বাধীন কোনো প্রমাণের কথা পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি।
গ্রেপ্তারের পর দীর্ঘ সময় কারাগারে
শরিফুল হাসানের পোস্টে বলা হয়, এক পাকিস্তানি নাগরিকের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর ২০২৩ সালের ১ আগস্ট নজরুল ইসলামকে আটক করা হয়। পরদিন ২ আগস্ট আটক হন সুইটি আক্তার। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও গত ১৪ অক্টোবর নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর সামনে আসে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে তাঁর পরিবার বা বাংলাদেশ দূতাবাসকে বিষয়টি জানানো হয়নি বলে পোস্টে দাবি করা হয়েছে। এ ঘটনায় নজরুলের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী ছিল, কোন প্রক্রিয়ায় তাঁর বিচার হয়েছে এবং কী ধরনের সাজা দেওয়া হয়েছিল—এসব তথ্য প্রকাশের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন শরিফুল হাসান।
নজরুলের বন্ধু রাহাত ভূঁইয়া বলেছেন, তাঁর বন্ধুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নজরুলের স্বভাবের সঙ্গে মেলে না বলে তাঁর বিশ্বাস। যে মাদ্রাসায় নজরুল পড়াশোনা করেছিলেন, সেই প্রতিষ্ঠানের সুপারিনটেনডেন্ট মাওলানা নাঈমুর রহমানও তাঁকে ভালো আচরণের শিক্ষার্থী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, নজরুলের আচরণে কখনো খারাপ কিছু দেখেননি।
ছেলের মরদেহ শেষবার দেখতে চান মা
নজরুলের মা রহিমা বেগমের আকুতি তুলে ধরে শরিফুল হাসান লেখেন, তাঁর ছেলে এক মাস পরপর ফোন করতেন। কথা বলার সুযোগও ছিল খুব সীমিত—এক থেকে দুই মিনিট। মায়ের দাবি, ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। তিনি শেষবারের মতো ছেলের মরদেহ দেখতে চান।
শরিফুল হাসানের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদেশে ছেলেকে পাঠাতে পরিবারকে ঋণ করতে হয়েছিল। সেই ছেলেকে ঘিরে পরিবারের যে আশা ও স্বপ্ন ছিল, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে তা ভেঙে পড়েছে। ছেলের সঙ্গে আর কথা বলতে না পারার পাশাপাশি তাঁর মরদেহ শেষবার দেখার আকুতিও এখন পরিবারটির গভীর বেদনার অংশ হয়ে উঠেছে।
দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
শরিফুল হাসান জানান, ঘটনার পর বাংলাদেশ দূতাবাস সংশ্লিষ্ট মামলা ও রায়ের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে দূতাবাসকে না জানানোর বিষয়টি কেন ঘটেছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
তিনি ১৯৬৩ সালের কনস্যুলার সম্পর্কবিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশনের ৩৬ অনুচ্ছেদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, আটক বিদেশি নাগরিককে কনস্যুলার যোগাযোগের অধিকার সম্পর্কে বিলম্ব না করে জানানো এবং কনস্যুলার সহায়তার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, নজরুলের গ্রেপ্তার, বিচার ও সাজা সম্পর্কে দূতাবাস কী তথ্য পেয়েছিল এবং তাঁর আইনি সুরক্ষায় কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
পোস্টে আরও বলা হয়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ দূতাবাসকে দেওয়া একটি তালিকায় জেদ্দা সংশোধনাগারে থাকা নজরুলের বিরুদ্ধে সাইবার ক্রাইম বা তথ্যপ্রযুক্তিসংক্রান্ত অপরাধে দণ্ডের কথা উল্লেখ ছিল। তবে কখন তাঁকে সাজা দেওয়া হয়েছে কিংবা সাজার বিস্তারিত কী, তা তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি বলে দাবি করেছেন শরিফুল হাসান।
একই তালিকায় সুইটি আক্তারের অবস্থান জেদ্দা মহিলা কারাগারে উল্লেখ ছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের অভিযোগের কথা বলা হয়েছিল। তবে তাঁর সাজা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যও ছিল না বলে পোস্টে উল্লেখ করা হয়।
শরিফুল হাসান প্রশ্ন তুলেছেন, নজরুলের বিরুদ্ধে ঠিক কী অভিযোগ আনা হয়েছিল, কী প্রমাণের ভিত্তিতে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয় এবং কেন মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলো—এসব বিষয় পরিষ্কারভাবে জানা প্রয়োজন। তাঁর মতে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও মামলার নথি, রায় ও বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের জবাবদিহি দাবি
শরিফুল হাসান তাঁর পোস্টে বলেন, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার রক্ষা শুধু সংশ্লিষ্ট পরিবারের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব। প্রবাসীদের কেবল রেমিট্যান্স পাঠানো মানুষ হিসেবে না দেখে অধিকারসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, দীর্ঘ সময় একজন বাংলাদেশি নাগরিক বিদেশের কারাগারে থাকার পরও তাঁর আইনি সুরক্ষা ও কূটনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিয়েছিল। তাঁর মতে, নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাটি প্রবাসীদের সুরক্ষায় বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
পোস্টের শেষাংশে শরিফুল হাসান দেশের প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বিদেশে বাংলাদেশিদের প্রতি সম্মান ও অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দেশের ভেতরে নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বিদেশে তাঁদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা ও জবাবদিহি প্রয়োজন।