সৌরবিদ্যুতের যন্ত্রাংশ চুরি করলে ৩ বছরের জেল, ক্ষতিতে ৫ বছর

সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা এবং এ খাতের কার্যক্রমে শৃঙ্খলা আনতে ‘বিশেষ সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করেছে সরকার। নতুন অধ্যাদেশে সৌরবিদ্যুতের বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরির জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড এবং ব্যবস্থার যন্ত্রাংশের ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। পাশাপাশি জরিমানা, নেট-মিটারিং, বিনিয়োগ কাঠামো ও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প পরিচালনার নিয়মও নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ অধ্যাদেশটি জারি করে। এর আগে রোববার (১৮ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।
বৈঠক শেষে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি খাতে দেশের দুর্বলতা প্রকাশ পাওয়ায় সরকার সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি জানান, সরকারি ও বেসরকারি ভবন, বাসাবাড়ি এবং পতিত জমিসহ বিভিন্ন স্থানে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে। এ জন্য মূলধনি ব্যয় (ক্যাপেক্স) ও পরিচালন ব্যয়ভিত্তিক (ওপেক্স) দুই ধরনের মডেল রাখা হয়েছে।
ওপেক্স মডেলে বিনিয়োগকারী সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের ব্যয় বহন করবেন। অন্যদিকে ক্যাপেক্স মডেলে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্প স্থাপন করে এর মালিকানা রাখতে পারবে।
ছাদ, আঙিনা ও জলাশয়েও স্থাপন করা যাবে সৌরবিদ্যুৎ
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি কোম্পানি এবং বাসাবাড়ির ছাদ, আঙিনা, ভবনসংলগ্ন পতিত জমি ও জলাশয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা যাবে। এর আওতায় সৌরচালিত সেচপাম্প, কোল্ড স্টোরেজ, বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশন, চা বাগান, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ এবং কৃষিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পও থাকবে। তবে বৃহৎ ভূমিভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প এ অধ্যাদেশের আওতাভুক্ত হবে না।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি হ্রাস, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০’ প্রণয়ন করা হয়েছে।
আগামী গ্রীষ্মের আগে তিন থেকে চার হাজার মেগাওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকার প্রণোদনাও ঘোষণা করেছে। সরকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ভবনের ছাদে বিনিয়োগকারীর অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিজস্ব আয় রয়েছে, এমন প্রতিষ্ঠান ভবিষ্যৎ আয়ের হিসাব বিবেচনায় ক্যাপেক্স মডেলেও এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারবে।
ত্রিপক্ষীয় চুক্তি ও নেট-মিটারিংয়ের সুবিধা
সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে গ্রাহক, সার্ভিস প্রোভাইডার এবং উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করতে হবে। চুক্তিতে যন্ত্রপাতির গুণগত মান, নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ বণ্টন, বিল পরিশোধ, মালিকানা, চুক্তির মেয়াদ ও বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ যন্ত্রপাতি ফেরত নেওয়া এবং ই-বর্জ্য নিরাপদে ব্যবস্থাপনার বিষয়ও চুক্তিতে রাখতে হবে।
অধ্যাদেশে নেট-মিটারিংয়ের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় গ্রাহক নিজের সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারবেন। গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণ বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে। এরপরও বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকলে সরকার নির্ধারিত ট্যারিফ অনুযায়ী তার মূল্য পাওয়া যাবে। এ ছাড়া নেট-মিটারিংয়ের আওতায় প্রণোদনা দেওয়ার ক্ষমতাও সরকারের থাকবে।
পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত ক্রয়ে বিশেষ বিধান
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য ক্যাপেক্স মডেলে সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে পণ্য ও সংশ্লিষ্ট সেবা কেনার আর্থিক সীমা সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে না।
যোগ্য সার্ভিস প্রোভাইডারদের জেলাভিত্তিক তালিকা তৈরি করা হবে। প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান সেবা প্রদানকারী নির্বাচন করতে পারবে। তবে গ্রাহক চাইলে ওপেক্স মডেলে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠান বেছে নিতে পারবেন।
বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, আগে ওপেক্স মডেলে সার্ভিস প্রোভাইডারের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে ১৫ বছর মেয়াদে বিদ্যুৎ ব্যবহারের মূল্য নির্ধারণ, ছাদ ব্যবহারের বিনিময়ে বিদ্যুতের অংশ দেওয়া এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান ছিল না। একইভাবে ক্যাপেক্স মডেলে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন ও সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি আইনে সুস্পষ্ট বিধান ছিল না। এসব ঘাটতি পূরণে নতুন অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি করা হয় বলে জানিয়েছে বিভাগটি।
জাতীয় পলিসি কাউন্সিল ও স্থানীয় কমিটি গঠন
সৌরবিদ্যুতের সম্প্রসারণ এবং নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে জাতীয় পলিসি কাউন্সিল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সংশ্লিষ্ট সচিবেরা থাকবেন।
কাউন্সিলটি বিনিয়োগ, নেট-মিটারিং, প্রণোদনা ও ট্যারিফ কাঠামোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে। এ ছাড়া জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক এবং উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে সভাপতি করে কারিগরি ও সমন্বয় কমিটি গঠন করা হবে। এসব কমিটি সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে সহায়তা, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, প্রশিক্ষণ, বিরোধ নিষ্পত্তি এবং বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব পালন করবে।
টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) তাদের ওয়েবসাইটে স্থাপিত সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার তথ্য সংরক্ষণ এবং সেগুলোর সচলতা পর্যবেক্ষণ করবে।
চুরি ও ক্ষতিসাধনে কারাদণ্ড-জরিমানা
অধ্যাদেশের ১২ ধারায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে বিদ্যুৎ বা যন্ত্রাংশ চুরির শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। চোরাই বলে জানা সত্ত্বেও এসব যন্ত্রাংশ কেনা, বিক্রি বা নিজের হেফাজতে রাখলেও একই শাস্তির বিধান রয়েছে।
১৩ ধারায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার যন্ত্রাংশের ক্ষতিসাধনের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
১৪ ধারা অনুযায়ী, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে অন্য কাউকে অবৈধ সংযোগ দিলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
অধ্যাদেশের ১৫ ধারায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, সংযোগ, পরিদর্শন বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তা, কর্মচারী কিংবা সার্ভিস প্রোভাইডারকে বাধা দেওয়ার শাস্তিও নির্ধারণ করা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।
১৬ ধারা অনুযায়ী, অধ্যাদেশের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা, ষড়যন্ত্র বা প্ররোচনার মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত করালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকেও মূল অপরাধের জন্য নির্ধারিত একই দণ্ড দেওয়া যাবে।
প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার
অধ্যাদেশের অধীন অপরাধের বিচার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হবে। এসব অপরাধ মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলভুক্ত হলে মোবাইল কোর্টেও বিচার করা যাবে।
তদন্ত, তল্লাশি, জব্দ, গ্রেফতারসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে অধ্যাদেশের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ কোনো বিধান না থাকলে ফৌজদারি কার্যবিধি প্রযোজ্য হবে।