গর্ভধারণের চেষ্টা করলে দিনে কতটা কফি পান করা নিরাপদ

গর্ভধারণের পরিকল্পনা করলেই সকালের কফি পুরোপুরি বাদ দিতে হবে—এমন নয়। তবে প্রতিদিন মোট কতটা ক্যাফেইন গ্রহণ করছেন, সেদিকে নজর রাখা জরুরি। বিশেষ করে যারা নিয়মিত একাধিক কাপ কফি বা চা পান করেন, তাদের ক্ষেত্রে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, গর্ভধারণের চেষ্টা করা অবস্থায় প্রতিদিনের মোট ক্যাফেইন গ্রহণ ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে রাখা ভালো। আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিনের (ASRM) তথ্য অনুযায়ী, দিনে এক থেকে দুই কাপ কফির সমপরিমাণ পরিমিত ক্যাফেইন গ্রহণ ফার্টিলিটির ওপর উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মিলিগ্রাম বা তার বেশি ক্যাফেইন গ্রহণ ফার্টিলিটি কমার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
ক্যাফেইন একটি উদ্দীপক পদার্থ, যা শুধু কফি বা চাতেই নয়; কোলা, এনার্জি ড্রিংকস, চকোলেট এবং কিছু সাপ্লিমেন্টেও থাকে। তাই শুধু দিনে কয় কাপ কফি বা চা পান করছেন, তা হিসাব করলেই ক্যাফেইন গ্রহণের সঠিক পরিমাণ জানা যায় না।
গবেষণাগুলোতে ক্যাফেইন ও ফার্টিলিটির সম্পর্ক নিয়ে সব সময় একই ধরনের ফল পাওয়া যায়নি। তবে প্রাপ্ত তথ্য থেকে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে এক কাপ কফি পান করলেই গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি হবে। বরং গর্ভধারণের চেষ্টা করছেন এমন ব্যক্তিদের নিয়মিত উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন গ্রহণ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আরেকটি বিষয় হলো, গর্ভধারণের বিষয়টি বোঝার আগেই শরীরে গর্ভাবস্থার প্রাথমিক সময় শুরু হয়ে যেতে পারে। এ কারণে গর্ভাবস্থাতেও সাধারণত প্রতিদিন ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে ক্যাফেইন সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ গর্ভপাতসহ গর্ভাবস্থাজনিত কিছু ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
কোন পানীয়ে কতটা ক্যাফেইন?
ক্যাফেইনের পরিমাণ পানীয়ের ধরন, পরিবেশনের আকার, ব্র্যান্ড এবং তৈরির পদ্ধতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। এনএইচএসের আনুমানিক হিসাবে প্রতি কাপে ইনস্ট্যান্ট কফিতে প্রায় ১০০ মিলিগ্রাম এবং প্রতি মগ ফিল্টার কফিতে প্রায় ১৪০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকতে পারে। এক মগ চায়ে প্রায় ৭৫ মিলিগ্রাম, একটি সফট ড্রিঙ্কের ক্যানে প্রায় ৪০ মিলিগ্রাম এবং ২৫০ মিলিলিটারের এনার্জি ড্রিঙ্কে সর্বোচ্চ প্রায় ৮০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকতে পারে। ৫০ গ্রাম ডার্ক চকোলেটে ক্যাফেইনের পরিমাণ সাধারণত ২৫ মিলিগ্রামের কম হতে পারে।
অর্থাৎ দুই মগ ফিল্টার কফি পান করলেই প্রায় ২৮০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন গ্রহণ হতে পারে, যা দৈনিক ২০০ মিলিগ্রামের পরামর্শকৃত সীমার চেয়ে বেশি।
চা বা গ্রিন টি কি নিরাপদ বিকল্প?
কফির পরিবর্তে চা পান করলে অনেক ক্ষেত্রে ক্যাফেইনের পরিমাণ কমানো সম্ভব। তবে ব্ল্যাক টি ও গ্রিন টি—দুটিতেই ক্যাফেইন থাকে। চায়ের ধরন, কতটা ঘন করে তৈরি করা হচ্ছে এবং কতক্ষণ ভেজানো হচ্ছে, তার ওপর ক্যাফেইনের পরিমাণ নির্ভর করে।
যারা দিনে কয়েক কাপ কফি বা চা পান করেন, তারা ধীরে ধীরে ক্যাফেইনমুক্ত পানীয়ের দিকে যেতে পারেন। প্যাকেটজাত পানীয় কেনার ক্ষেত্রে লেবেল দেখে ক্যাফেইনের পরিমাণ যাচাই করাও উপকারী।
হঠাৎ ক্যাফেইন বন্ধ করা কি দরকার?
নিয়মিত বেশি পরিমাণে ক্যাফেইন গ্রহণ করলে হঠাৎ তা বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। একেবারে বন্ধ করে দিলে কারও কারও মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা বিরক্তির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই ধীরে ধীরে পরিমাণ কমানো তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
প্রথমে প্রতিদিনের একটি ক্যাফেইনযুক্ত পানীয়ের পরিবর্তে ক্যাফেইনমুক্ত পানীয় নেওয়া যেতে পারে। আবার কফির ঘনত্ব কমানো বা কয়েক দিন পরপর একটি করে ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় কমিয়েও অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব।
এনার্জি ড্রিংকস নিয়ে কেন সতর্কতা?
গর্ভধারণের চেষ্টা করার সময় এনার্জি ড্রিংকস এড়িয়ে চলাই ভালো বলে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন। এসব পানীয়তে ক্যাফেইনের পাশাপাশি অন্যান্য উদ্দীপক উপাদান ও অতিরিক্ত চিনি থাকতে পারে। ফলে অজান্তেই দৈনিক ক্যাফেইনের পরিমাণ প্রস্তাবিত সীমার ওপরে চলে যেতে পারে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত এনার্জি ড্রিংক গ্রহণ হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। এর পরিবর্তে পানি বা ক্যাফেইনমুক্ত উপযুক্ত পানীয় বেছে নেওয়া যেতে পারে।
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলেই ক্যাফেইন সম্পূর্ণ বাদ দিতে হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই। তবে দৈনিক মোট ক্যাফেইন গ্রহণ ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। কফি, চা, চকোলেট, কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংকস ও সাপ্লিমেন্ট—সব উৎসের ক্যাফেইন হিসাবের মধ্যে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
গর্ভধারণ-পূর্ব স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ক্যাফেইন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ, ধূমপান ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজন হলে গর্ভধারণের পরিকল্পনা নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।