আর্জেন্টিনায় ‘অপ্রিয়’ মেসি যেভাবে হয়ে উঠলেন ‘দেবতা’

আর্জেন্টিনার জার্সিতে লিওনেল মেসির শেষ অধ্যায় যেন এক বৃত্ত পূর্ণ হওয়ার গল্প। একসময় যাকে জাতীয় দলের ব্যর্থতার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছিল, সেই মেসিই পরবর্তী সময়ে হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ফুটবল নায়ক। এক দশক আগে যে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে হতাশ হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেখানেই ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল দিয়ে শেষ হলো তার জাতীয় দলের দীর্ঘ যাত্রা।
বিদায়ের আগে মেসির কথাতেও ছিল সেই দীর্ঘ পথচলার প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেছেন, জাতীয় দলের হয়ে তিনি সবসময় নিজের শতভাগ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। শুধু সাফল্যের সময় নয়, ব্যর্থতার সময়ও চেয়েছেন আর্জেন্টিনার মানুষ যেন ফুটবলের মাধ্যমে গর্ব অনুভব করতে পারেন।

যে মেসিকে একসময় শুনতে হয়েছিল সমালোচনা
২০১৬ সালের আগে পর্যন্ত জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির গল্পটা ছিল অনেকটা আক্ষেপের। ক্লাব ফুটবলে বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক সাফল্য পেলেও আর্জেন্টিনার হয়ে বড় শিরোপা জিততে পারছিলেন না তিনি।
২০০৭ ও ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনাল, ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল—বারবার শিরোপার খুব কাছে গিয়েও শেষ পর্যন্ত হতাশ হতে হয়েছে মেসিকে। ২০১৬ সালে চিলির বিপক্ষে কোপা আমেরিকার ফাইনালে টাইব্রেকারে পেনাল্টি মিস করার পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
সেই হারের পর মাত্র ২৯ বছর বয়সেই আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন মেসি।

তখন তার কণ্ঠে ছিল গভীর হতাশা। জাতীয় দলের হয়ে সবকিছু দেওয়ার পরও শিরোপা জিততে না পারার যন্ত্রণা তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছিল। একপর্যায়ে তিনি মনে করেছিলেন, সরে দাঁড়ানোই হয়তো সবার জন্য ভালো হবে।
ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনাও ছিল বড় চাপ
আর্জেন্টিনার ফুটবলে দিয়েগো ম্যারাডোনার প্রভাব এতটাই গভীর যে, তার সঙ্গে তুলনা এড়াতে পারেননি মেসি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয় মেসির ওপর প্রত্যাশার চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
মেসি বার্সেলোনার হয়ে অসংখ্য শিরোপা জিতলেও জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থ হলেই তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে। সমালোচকেরা কখনো তার নেতৃত্ব, কখনো বড় ম্যাচে পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
এমনকি আর্জেন্টিনায় তাকে ‘পেচো ফ্রিও’—অর্থাৎ বড় চাপের মুহূর্তে আবেগ ও লড়াইয়ের ঘাটতি রয়েছে—এমন অপমানসূচক তকমাও শুনতে হয়েছে।
অন্যদিকে, বার্সেলোনায় তার সাফল্যের সঙ্গে আর্জেন্টিনার ব্যর্থতার তুলনা তাকে মানসিকভাবে আরও চাপে ফেলত। মেসি নিজেও একসময় বলেছেন, ক্লাবে যেখানে তিনি নিয়মিত ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছেন, জাতীয় দলের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।
অবসর বদলে আবার ফিরলেন মেসি
২০১৬ সালের অবসর ঘোষণা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। দেশজুড়ে সমর্থকদের আবেগ, সতীর্থ ও কোচদের অনুরোধ এবং নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসা শেষ পর্যন্ত মেসিকে সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য করে।
জাতীয় দলে ফিরে তিনি জানিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনা ও এই জার্সির প্রতি তার ভালোবাসা সবসময়ই ছিল। সমর্থকদের আনন্দ দেওয়ার মতো কিছু করার ইচ্ছাও তার ছিল।

তবে প্রত্যাবর্তনের পরও পথ সহজ হয়নি। ২০১৮ বিশ্বকাপে শেষ ষোলো থেকেই আর্জেন্টিনার বিদায় ঘটে। মেসির বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন তখনও অধরা।
২০২১ সালে বদলে গেল সবকিছু
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০২১ সালে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। জাতীয় দলের হয়ে মেসির প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি আসে ৩৪ বছর বয়সে।
এই একটি শিরোপাই যেন মেসির ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
এরপর ওয়েম্বলিতে ইতালিকে হারিয়ে ফিনালিসিমা জয় করে আর্জেন্টিনা। আর ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ হয়ে ওঠে মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়।
ফ্রান্সের বিপক্ষে রোমাঞ্চকর ফাইনালে জিতে বিশ্বকাপ হাতে তোলেন মেসি। যে শিরোপার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা, সমালোচনা ও হতাশা সহ্য করতে হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ট্রফিই উঠেছিল তার হাতে।
‘অপছন্দের’ মেসি হয়ে গেলেন জাতীয় নায়ক
কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনায় মেসিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি পুরোপুরি পাল্টে যায়।
যে মানুষটিকে একসময় জাতীয় দলের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হতো, তিনিই হয়ে ওঠেন দেশের সবচেয়ে প্রিয় ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের একজন।
মেসিও পরে বলেছেন, তার প্রতি আর্জেন্টাইনদের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘদিনের সমালোচনার পর দেশের মানুষের ভালোবাসা পাওয়াকে তিনি নিজের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে দেখেছেন।
তার স্ত্রী আন্তোনেলা রোকুজ্জোও মেসির কঠিন সময়ের সাক্ষী ছিলেন। বছরের পর বছর ব্যর্থতা, সমালোচনা ও হতাশার মধ্যেও মেসি কীভাবে চেষ্টা চালিয়ে গেছেন, তা তিনি কাছ থেকে দেখেছেন।
রোজারিও থেকে বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে
মেসির গল্প অবশ্য শুরু হয়েছিল আর্জেন্টিনার রোজারিও শহর থেকে।
শৈশবেই তার ফুটবল প্রতিভা নজরে আসে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনার স্কাউটদের নজরে পড়েন তিনি। তবে তার শারীরিক বৃদ্ধির সমস্যা ছিল এবং প্রয়োজন ছিল গ্রোথ হরমোন চিকিৎসার।
পরিবারের পক্ষে সেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়ায় বার্সেলোনা তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর মেসির জীবনে আসে বড় পরিবর্তন।

২০০১ সালে তিনি পরিবারের একটি অংশকে আর্জেন্টিনায় রেখে স্পেনে পাড়ি জমান। নতুন দেশ, নতুন পরিবেশ ও পরিবার থেকে দূরত্ব—সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই ধীরে ধীরে বার্সেলোনার ফুটবল একাডেমিতে নিজেকে গড়ে তোলেন।
এরপরের গল্প ফুটবল ইতিহাসেরই অংশ।
বার্সেলোনার হয়ে একের পর এক রেকর্ড, লা লিগা, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ব্যালন ডি’অর—সব মিলিয়ে মেসি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন প্রজন্মের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে।
তবে জাতীয় দলের সাফল্যের অভাব তার ক্যারিয়ারে দীর্ঘদিন একটি অপূর্ণতা হয়ে ছিল।
শেষ বিশ্বকাপেও দেখিয়েছেন নিজের সামর্থ্য
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল মেসির ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। বয়স তখন ৩৯ বছর। আগের মতো গতি হয়তো ছিল না, কিন্তু মাঠে তার প্রভাব কমেনি।
আর্জেন্টিনাকে ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার পথে মেসি করেছেন আট গোল ও চারটি অ্যাসিস্ট। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয় আর্জেন্টিনার।
তবে মেসির জন্য ম্যাচটির তাৎপর্য ছিল অন্য জায়গায়।

এক দশক আগে যে মেটলাইফ স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে তিনি জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন, ২০২৬ সালে সেই একই মাঠেই খেলেছেন নিজের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ।
দুটি মুহূর্তের মাঝে কেটে গেছে একটি পুরো দশক। সেই সময়ে মেসির জীবন ও ক্যারিয়ারে এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন।
১৯ নম্বর থেকে ১০ নম্বর জার্সির কিংবদন্তি
বিশ্বকাপে মেসির যাত্রার শুরু হয়েছিল ১৯ নম্বর জার্সি দিয়ে। সময়ের সঙ্গে সেই জার্সি বদলে যায় ১০ নম্বরে।
আর ১০ নম্বর জার্সিই শেষ পর্যন্ত মেসির পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
ক্যারিয়ারের শেষ দিকে তার অর্জনের তালিকায় যোগ হয় দুটি বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল, একটি বিশ্বকাপ শিরোপা, কোপা আমেরিকা ও অসংখ্য ব্যক্তিগত পুরস্কার।
তবে পরিসংখ্যানের বাইরেও মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত আর্জেন্টাইনদের হৃদয়ে নিজের জায়গা তৈরি করা।
যে গল্পের শেষটা ভালোবাসায়
একসময় যে সমালোচনা তাকে জাতীয় দল থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল, সময়ের সঙ্গে সেই সমালোচনাই বদলে গেছে ভালোবাসায়।
ব্যর্থতার দায়ে অভিযুক্ত মেসিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনাকে এনে দিয়েছেন কোপা আমেরিকা, ফিনালিসিমা ও বিশ্বকাপের মতো বড় শিরোপা।
তাই আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির বিদায় শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয়; এটি দীর্ঘ অপেক্ষা, হতাশা, প্রত্যাবর্তন এবং পূর্ণতার একটি গল্পের সমাপ্তি।
রোজারিওর ছোট্ট ছেলেটি শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নামগুলোর একটি। আর এক দশক আগে যে মেসি কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিয়েছিলেন, বিদায়ের সময়ে সেই মেসির জন্য ছিল কোটি মানুষের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা।