মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
Natun Kagoj

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ
গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) আজ ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারিতে আবারও সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে দলটি। কিন্তু ক্ষমতায় ফেরার ছয় মাস না পেরোতেই অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, জ্বালানি, দ্রব্যমূল্য, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং দলীয় শৃঙ্খলাসহ নানা বিষয়ে পরীক্ষার মুখে পড়েছে বিএনপি।

দলের নেতারা অবশ্য বলছেন, রাজনৈতিক জীবনে বিএনপি বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছে। অতীতের মতো এবারও সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকার পরিচালনায় সফল হওয়ার ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী।

৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিএনপিকে ‘চ্যাম্পিয়ন দল’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। গতকাল সোমবার আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, বিএনপির অতীত গৌরব ও অবদান দেশের রাজনীতি ও উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বহুদলীয় গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকার রক্ষা, উন্নয়ন-উৎপাদন এবং আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে বিএনপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গণতন্ত্রের প্রতিটি সংকট এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানেও দলটির নেতা-কর্মীদের আত্মত্যাগ রয়েছে।

বিএনপি ও সরকারের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে রিজভী বলেন, ‘চ্যালেঞ্জ থাকবেই। যে কাজের সামনে চ্যালেঞ্জ থাকবে না, সেটা তো উন্নত কাজ নয়। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।’

 ক্ষমতায় ফেরার পর নতুন বাস্তবতা

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে দলটি। দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থাকার পর আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ায় বিএনপির সামনে তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা।

গত ছয় মাসে অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রশাসন, পররাষ্ট্রনীতি ও বিভিন্ন খাতে একাধিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার। নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কাজ এগিয়ে চলছে বলেও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।

তবে সরকারের এই মূল্যায়নের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি থাকলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত কয়েকটি বিষয়ে সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। এর মধ্যে আইনশৃঙ্খলা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট, দ্রব্যমূল্য, প্রশাসনিক সমন্বয়, দলীয় প্রভাব এবং কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে পরিকল্পনা ও স্বপ্নের কথা বলছেন, তা সরকারের সব পর্যায়ে যথাযথভাবে পৌঁছাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, ‘প্রধানমন্ত্রী যে প্ল্যানের কথা বলেছেন, স্বপ্নের কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কেন জানি মনে হয়, উনি যে বার্তা দিতে চাচ্ছেন, উনার মন্ত্রিসভা থেকে শুরু করে উপদেষ্টা ও নেতা-কর্মীদের কাছে তা সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।’

 দৈনন্দিন জীবনের সংকটই বড় পরীক্ষা

বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসে সাধারণ মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলোই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। দ্রব্যমূল্য এখনো মানুষের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাজারে তার সুফল কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট। শিল্পকারখানা থেকে শুরু করে সাধারণ ভোক্তা—জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতির প্রভাব বিভিন্ন পর্যায়ে পড়ছে। লোডশেডিং ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা অর্থনীতির পাশাপাশি জনজীবনেও চাপ তৈরি করছে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেছেন, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলার দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও অপরাধ দমনে অগ্রগতির কথা বলা হয়েছে। তবে বিরোধী দল ও সমালোচকদের মতে, মানুষের প্রত্যাশা এর চেয়ে বেশি ছিল।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সরকারের ১৮০ দিনের মূল্যায়নে দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি, আইনশৃঙ্খলা, স্বাস্থ্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে ব্যর্থতার অভিযোগ করেছে। একই সঙ্গে সরকার পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ফিরে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি।

দল ও সরকারের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন

প্রায় দুই দশক রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে থাকলেও বিএনপি তার সাংগঠনিক কাঠামো ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। জেলা, মহানগর, উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে দলের সংগঠন সক্রিয় ছিল। ছয় মাস আগের নির্বাচনে এই সাংগঠনিক শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন দলটির নেতারা।

তবে ক্ষমতায় আসার পর সংগঠনের ভূমিকা ও নেতা-কর্মীদের অবস্থান বদলে গেছে। বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় আন্দোলন ও রাজনৈতিক কর্মসূচিই ছিল তাঁদের প্রধান কর্মকাণ্ড। এখন তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনপ্রতিনিধিত্ব, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন প্রকল্প, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নানা বিষয়।

ফলে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের আচরণ ও ভূমিকা নিয়ে বাড়তি নজর রয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও বিভিন্ন সময় নেতা-কর্মীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের নেতাদের যোগ্য প্রার্থীদের সমর্থনের পাশাপাশি অনৈতিক কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর নির্দেশনাও দিয়েছেন তিনি।

সমালোচকদের একটি অংশের অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পর দল ও সরকার কার্যত একাকার হয়ে গেছে। তবে বিএনপির নেতারা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দল দলের জায়গায় আছে। দলের নেতৃত্ব সরকারে আছেন, সরকার পরিচালনা করছেন। দল আর সরকার একাকার হয়ে গেছে, এটা বলা ঠিক হবে না।’

তবে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, শুধু সরকার পরিচালনা নয়, বিএনপির নিজেদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও পরিবর্তন আনা জরুরি। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিএনপি যা করছে, তার চেয়ে ভালো করতে হবে। দলে যদি গণতন্ত্র না থাকে, দেশেও গণতন্ত্র হবে না। দলে প্রথমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সত্যিকার অর্থে রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে হবে। তা না হলে যে লাউ, সেই কদুই হবে।’

দীর্ঘ সংগ্রামের পর ক্ষমতায় বিএনপি

বিএনপির নেতারা মনে করেন, দলটির বর্তমান অবস্থানে আসার পথ সহজ ছিল না। একাধিকবার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা, হামলা-মামলা, নির্যাতন, রাজনৈতিক বাধা ও নানা সমালোচনার মধ্য দিয়েই দলটি টিকে আছে।

একসময় বিএনপি রাজনৈতিকভাবে শেষ হয়ে যাবে—এমন ধারণাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে দলটি আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরকার পরিচালনা করছেন।

বিএনপির নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার সময় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যে লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে দল গঠন করেছিলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তা এগিয়ে নিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় বিএনপি এখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কাজ করছে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে ক্ষমতায় ফেরা যতটা বড় অর্জন, ক্ষমতায় থেকে জনগণের আস্থা ধরে রাখা তার চেয়ে বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় জনগণের প্রত্যাশা তৈরি করা তুলনামূলক সহজ হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার সময় সেই প্রত্যাশা বাস্তব ফলাফলে রূপ দেওয়া অনেক কঠিন।

সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন

ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির সামনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা স্থানীয় সরকার নির্বাচন। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে জনপ্রতিনিধি হওয়ার আগ্রহ বাড়ছে। ফলে প্রার্থী নির্বাচন, অভ্যন্তরীণ বিরোধ, দলীয় শৃঙ্খলা এবং ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহারের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।

এ ক্ষেত্রে দলীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নেতা-কর্মীদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা এবং প্রশাসনের ওপর দলীয় প্রভাব বিস্তার না করার বিষয়টি সরকারের গ্রহণযোগ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি। আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সারা দেশের দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে।

সকালে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন।

কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া উপযুক্ত সময়ে মৎস্য অবমুক্তকরণ ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পালন করা হবে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায়ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেছে এবং করছে। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিএনপি জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চায়।

৪৮ বছরে এসে বিএনপির সামনে তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু ক্ষমতায় ফিরে আসা নয়, ক্ষমতায় থেকে কীভাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা যায়। দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, প্রশাসনে জবাবদিহি, দলীয় শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন—এসব ক্ষেত্রেই আগামী দিনে সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতা পরিমাপ হবে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ক্ষমতায় ফিরে পাওয়া সুযোগকে বিএনপি কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, সেটিই এখন দলটির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
 


গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন