শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
Natun Kagoj
শিরোনাম
  • দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল গুইমারায় গর্ভবতী নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ সমাপ্ত ২৫৫ ভোটে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘সুযোগ পেলে আওয়ামী লীগের চেয়েও বড় ফ্যাসিস্ট হবে জামায়াত’: নুর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট শেষ, চলছে গণনা রাষ্ট্রপতির শপথেই শেষ হবে ফখরুলের এমপি-মন্ত্রিত্ব: চিফ হুইপ সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তনের কথা জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গ্রিন ফাইন্যান্স মিললে সোলারে যাবে ১,৩০০ পোশাক কারখানা অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাফল্যের ফর্মুলা জানালেন সিমন্স র‍্যাব বিলুপ্ত হলেও বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তি হবে: ইন্তেখাব
  • বিশ্ব মশা দিবসে চট্টগ্রামের মশক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন, ৫ কোটি টাকা ব্যয়েও বাড়ছে ডেঙ্গু

    বিশ্ব মশা দিবসে চট্টগ্রামের মশক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশ্ন, ৫ কোটি টাকা ব্যয়েও বাড়ছে ডেঙ্গু
    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    মশক নিয়ন্ত্রণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করেও চট্টগ্রাম নগরীতে কমছে না মশার উপদ্রব। বরং বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার বিস্তার বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপেও নগরীর বিভিন্ন এলাকায় এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

    আজ ২০ আগস্ট বিশ্ব মশা দিবস। মশাবাহিত রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং এসব রোগ প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরতেই প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়।

    চট্টগ্রামে বাড়ছে ডেঙ্গু

    চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। এ সময় মারা গেছেন তিনজন। জুলাই মাসে আক্রান্ত হন ৫৩৬ জন। আর আগস্টের প্রথম ১৯ দিনেই নতুন করে ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে ৬৬৩ জনের। বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতালে ১৬৩ জন রোগী চিকিৎসাধীন।

    সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি থাকে। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। ২০২২ সালের জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২ হাজার ৬৪০ জন। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৩ জনে। ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৩৭ এবং ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৬০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন।

    চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে মাসে ৩৭ এবং জুনে ১২২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। এরপর জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৫৩৬ জনে পৌঁছায়। ওই মাসে দুজনের মৃত্যু হয়।

    চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জুলাই ও আগস্টের প্রথম দিকের আক্রান্তের সংখ্যা আগের ছয় মাসের মোট আক্রান্তের প্রায় দ্বিগুণ। বর্ষায় থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে এডিস মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। আক্রান্তদের অধিকাংশই সুস্থ হয়ে উঠছেন। তবে যারা মারা গেছেন, তারা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেরি করেছিলেন।

    জরিপে এডিসের ঘনত্ব উদ্বেগজনক

    স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রাক-বর্ষা জরিপে চট্টগ্রাম নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি আশঙ্কাজনক মাত্রায় পাওয়া গেছে।

    ৮ থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এসব বাড়ির মধ্যে ৯৯টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়। ৩৪৫টি পানির পাত্র পরীক্ষা করে ১১৪টিতে লার্ভার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়।

    জরিপে কনটেইনার ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ১০ শতাংশের নিচে। হাউস ইনডেক্স ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, নিরাপদ মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে। আর ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যেখানে নিরাপদ মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে।

    উত্তর কাট্টলী, পাঁচলাইশ, জালালাবাদ, পশ্চিম বাকলিয়া, দক্ষিণ বাকলিয়া, পাথরঘাটা, আন্দরকিল্লা ও দক্ষিণ হালিশহরকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

    বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ জানান, জরিপে পাওয়া লার্ভার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এডিস ইজিপ্টাই প্রজাতির। পানি সংকটের কারণে বাসাবাড়িতে সংরক্ষণ করা পানির পাত্র এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিস মশার অন্যতম প্রধান প্রজননস্থল হয়ে উঠেছে।

    মশক নিয়ন্ত্রণে ব্যয় সাড়ে ৫ কোটি টাকা

    ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও মশক নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ব্যয়ও কম নয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে শুধু মশার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনতেই প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বাইরে ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫০ লাখ টাকা।

    ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণ খাতে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫ সালে এ খাতে ব্যয় হয়েছিল ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

    ২০০০ সাল থেকে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে চসিকের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে গত এক দশকেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

    তারপরও চান্দগাঁও, মোহরা, বহদ্দারহাট, শুলকবহর, হামজারবাগ, জামালখান, চকবাজার ও হালিশহরসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা মশার উপদ্রব কমেনি বলে অভিযোগ করছেন।

    ৭০ লাখ মানুষের জন্য ৩৫৫ কর্মী

    চসিকের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে মশক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন ৩৫৫ জন কর্মী। সংস্থাটির দাবি, প্রতিটি ব্লকে ৭২ ঘণ্টা পরপর ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

    তবে নগরবাসীর অভিযোগ, অনেক এলাকায় নিয়মিত মশার ওষুধ ছিটানো হয় না। কোথাও কোথাও দীর্ঘদিন ধরে কর্মীদের দেখা মেলে না।

    চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, প্রায় ৭০ লাখ মানুষের নগরীতে মাত্র সাড়ে তিনশো কর্মী দিয়ে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম চালানো কঠিন। তারপরও সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

    তিনি বলেন, পূর্ণবয়স্ক মশা নিধনের চেয়ে লার্ভা ধ্বংস করা বেশি কার্যকর। তাই ফগিংয়ের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে লার্ভা ধ্বংসে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

    শুধু ওষুধ ছিটিয়ে সমাধান নয়

    বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু কীটনাশক ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কোন এলাকায় কোন প্রজাতির মশা রয়েছে, কোথায় প্রজননস্থল তৈরি হচ্ছে এবং কোন কীটনাশক কার্যকর—এসব বিষয়ে নিয়মিত জরিপ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।

    চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মো. আহসান হাবিব সিয়াম বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে কীটতত্ত্ববিদদের পর্যাপ্ত সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ছাড়া বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।

    নগর পরিকল্পনাবিদ মো. দেলোয়ার হোসেন মজুমদার বলেন, দীর্ঘদিন একই ধরনের কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে পারে। তাই কোন ওষুধ কার্যকর তা নিয়মিত পরীক্ষাগারে যাচাই করা জরুরি।

    চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা মো. শরফুল ইসলাম মাহি বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে ৬০ সদস্যের বিশেষ দল কাজ করছে। পাশাপাশি ছয় মাসের জন্য পর্যাপ্ত লার্ভিসাইড ও অ্যাডাল্টিসাইড মজুত রয়েছে।

    বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশক নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি নাগরিকদেরও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র ও নির্মাণাধীন ভবনে পানি জমতে না দেওয়া এবং জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ করাই এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকানোর অন্যতম কার্যকর উপায়।


    গুগল নিউজে (Google News) নতুন কাগজ’র খবর পেতে ফলো করুন

    সর্বশেষ

    আরও পড়ুন