কৃষিঋণে বড় পরিবর্তন, ব্যাংকের মোট ঋণের ৪% দিতে হবে কৃষিতে

কৃষি ও পল্লি খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬০ হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে প্রতিটি ব্যাংকের মোট ঋণ বিতরণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে। এতদিন এ হার ছিল ২ দশমিক ৫ শতাংশ।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতি ও কর্মসূচি ঘোষণা করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এফসিএমএ। এ সময় কৃষি ঋণের তদারকি জোরদারে ‘ওয়েবভিত্তিক কৃষি ঋণ ব্যবস্থাপনা তথ্য সফটওয়্যার’ উদ্বোধন করা হয়।
নতুন অর্থবছরের ৬০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা গত অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার চেয়ে ২১ হাজার কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কৃষি ও পল্লি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ।
লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার উদ্যোগ
নতুন নীতিমালায় প্রান্তিক কৃষক, নারী কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে জমি বা স্থাবর সম্পত্তির জামানতের পরিবর্তে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও দলগত জামানত গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে নীতিমালায় নির্ধারিত চার্জ দলিলের বাইরে অতিরিক্ত কোনো চার্জ দলিল না নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। লবণ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত দলিল গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
কৃষক কার্ডে যাচাই হবে পরিচয়
প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করতে নতুন পদ্ধতি যুক্ত করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রত্যয়ন গ্রহণের পাশাপাশি সরকার প্রবর্তিত কৃষক কার্ডের তথ্যও ব্যবহার করা যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এর ফলে প্রকৃত কৃষকের কাছে ঋণ পৌঁছানোর প্রক্রিয়া আরও সহজ ও কার্যকর হবে।
ঋণের জন্য পাসবইয়ের বাধ্যবাধকতা নেই
কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে পাসবই থাকা বা ইস্যুর বাধ্যবাধকতাও তুলে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক কৃষিতে ঋণ বিতরণের আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের প্রয়োজনীয়তা শিথিল করা হয়েছে।
শস্য ও ফসলের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও একক কৃষকের সঙ্গে দলবদ্ধ কৃষক ও খামারিদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। কৃষক দলের সদস্যসংখ্যার নির্ধারিত সীমাও শিথিল করা হয়েছে।
নতুন কয়েকটি খাত ঋণের আওতায়
এবারের কর্মসূচিতে কৃষি ও পল্লি ঋণের আওতায় নতুন কয়েকটি খাত যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হ্যাচারিতে মাছের পোনা উৎপাদন, হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালন রয়েছে।
এ ছাড়া শিমুল মূল, অশ্বগন্ধা, মিশ্রি দানা, রোজেলা, শতমূল, গাছ আলু ও ব্লুবেরি উৎপাদনের পাশাপাশি ডিমের খোসা থেকে জৈব সার তৈরির মতো কার্যক্রমও ঋণের আওতায় আনা হয়েছে।
জলবায়ু ঝুঁকি কমাতে বিমার সুযোগ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ায় নতুন নীতিমালায় কৃষি ঋণের সঙ্গে বিমা সুবিধা যুক্ত করার সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্যাংক ও কৃষক বা গ্রাহকের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এ সুবিধা নেওয়া যাবে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা জলবায়ুজনিত ক্ষতির ক্ষেত্রে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি কমাতে এ ব্যবস্থা সহায়ক হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
পুনঃঅর্থায়নে ১৩ হাজার কোটি টাকা
কৃষি খাতে অর্থায়ন বাড়াতে ১০ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম এবং ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের নীতিমালার সারসংক্ষেপ নতুন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি উন্নয়ন সাধারণ তহবিলের পরিচালনা নীতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।
ফসল কাটার সঙ্গে মিলিয়ে ঋণ পরিশোধ
কৃষকের ওপর ঋণ পরিশোধের চাপ কমাতে বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন পঞ্জিকা ও ঋণ পরিশোধের সময়সূচি নতুনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। কলা, পেঁপে, আম, লেবু, পেয়ারা ও লিচুর মতো ফসলের ক্ষেত্রে উৎপাদন ও সংগ্রহের সময় বিবেচনায় নিয়ে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ফসল সংগ্রহের পরপরই যাতে কৃষককে কিস্তি পরিশোধের চাপের মুখে পড়তে না হয়, সে বিষয়টিও নীতিমালায় বিবেচনা করা হয়েছে।
তদারকিতে ওয়েবভিত্তিক সফটওয়্যার
কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণ এবং ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন ওয়েবভিত্তিক সফটওয়্যার চালু করেছে। এর মাধ্যমে ঋণ কর্মসূচির তথ্য সংগ্রহ, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করা, ঋণের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ নীতি প্রণয়নে প্রয়োজনীয় তথ্য ব্যবহারে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
উৎপাদন বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যাশা, কৃষি খাতে ঋণের প্রবাহ বাড়লে উৎপাদন ও কৃষিপণ্যের সরবরাহ বাড়বে। এতে খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা মিলতে পারে।
একই সঙ্গে কৃষকের আয় বৃদ্ধি, গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য কমানো এবং পল্লি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রেও নতুন কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতি ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।