মার্জিন ঋণে নতুন নিয়ম, গেজেট প্রকাশ করে বিধিমালা কার্যকর করল বিএসইসি

শেয়ারবাজারে মার্জিন অর্থায়নের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশোধিত মার্জিন বিধিমালা, ২০২৫ গেজেট আকারে প্রকাশের মাধ্যমে নতুন নিয়মগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এতে মার্জিন ঋণের অনুপাত, ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা, মার্জিন কল, শেয়ার বিক্রি এবং অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
মঙ্গলবার বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আবুল কালামের স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানানো হয়। এর আগে সোমবার রাতে সংশোধিত বিধিমালার গেজেট প্রকাশ করা হয়।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত সব শেয়ার ও সিকিউরিটিজের জন্য মার্জিন ঋণের অনুপাত ১:১ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো বিনিয়োগকারীর নিজস্ব ইকুইটি যত টাকা থাকবে, তিনি সর্বোচ্চ সমপরিমাণ মার্জিন ঋণ নিতে পারবেন।
তবে সব শেয়ারে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না। জীবন বিমা কোম্পানি ছাড়া অন্য কোম্পানির ক্ষেত্রে প্রাইস-আর্নিং বা পিই অনুপাত ৪০-এর বেশি হলে সংশ্লিষ্ট শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না। কোনো কোম্পানির ইপিএস ঋণাত্মক হলেও ওই শেয়ার মার্জিন সুবিধার জন্য অযোগ্য হবে।
এ ক্ষেত্রে সর্বশেষ ট্রেডিং দিনের সমাপনী মূল্যকে সর্বশেষ চারটি ধারাবাহিক প্রান্তিকের ইপিএসের যোগফল দিয়ে ভাগ করে ট্রেইলিং পিই নির্ধারণ করা হবে।
জীবন বিমা কোম্পানির ক্ষেত্রে পিই অনুপাতের পরিবর্তে প্রাইস-টু-বুক বা পিবি অনুপাত বিবেচনায় নেওয়া হবে। কোনো জীবন বিমা কোম্পানির পিবি ৩-এর বেশি হলে অথবা শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভি) ঋণাত্মক হলে ওই শেয়ারে মার্জিন অর্থায়ন করা যাবে না।
মার্জিন সুবিধা নেওয়ার সময় কোনো গ্রাহকের হিসাবে স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজে কমপক্ষে ৩ লাখ টাকার বিনিয়োগ না থাকলে তাকে মার্জিন অর্থায়ন দেওয়া যাবে না।
এ ছাড়া মার্জিন সুবিধার অযোগ্য কোনো শেয়ার গ্রাহক নিজের অর্থে কিনলে সেই শেয়ারের মূল্যকে মার্জিন ঋণের জন্য তার ইকুইটি হিসেবে গণনা করা যাবে না। অর্থাৎ অযোগ্য শেয়ারে বিনিয়োগ করে সেটিকে জামানত হিসেবে দেখিয়ে অতিরিক্ত মার্জিন ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।
মার্জিন কলের নিয়মে পরিবর্তন
নতুন বিধিমালায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য মার্জিন কল ও শেয়ার বিক্রির ক্ষেত্রে নতুন সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পোর্টফোলিওর ইকুইটি ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারীকে মার্জিন কল বা আগাম নোটিশ দেবে।
এরপর ইকুইটি ২৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে কোনো আগাম নোটিশ ছাড়াই ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান শেয়ার বিক্রি করতে পারবে। তবে এ বিষয়ে গ্রাহককে লিখিতভাবে, ই-মেইল বা নিবন্ধিত মোবাইল নম্বরে বার্তা পাঠিয়ে জানাতে হবে। প্রয়োজন হলে ফোন কলের মাধ্যমেও তাকে অবহিত করা যাবে।
কোন শেয়ারে মিলবে না মার্জিন ঋণ
সংশোধিত বিধিমালায় ‘জেড’, ‘এন’ ও ‘জি’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ারে মার্জিন ঋণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একইভাবে এসএমই বোর্ড, অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) এবং ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্ত সিকিউরিটিজও এ সুবিধার বাইরে থাকবে।
শুধু স্টক এক্সচেঞ্জের মূল মার্কেটে তালিকাভুক্ত ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির শেয়ারে মার্জিন অর্থায়নের সুযোগ থাকবে।
এক শেয়ারে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ অর্থায়ন
মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমাতে একক সিকিউরিটিতে বিনিয়োগের সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো অর্থায়নকারী তার মোট বকেয়া মার্জিন অর্থায়নের ২০ শতাংশের বেশি একটি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগ বা অর্থায়ন করতে পারবে না।
মার্জিন চুক্তির মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে এক বছর। চুক্তির কোনো পক্ষ তা বাতিল না করলে মেয়াদ শেষে সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবায়ন হবে।
মার্জিন ঋণের অর্থ শুধু মার্জিন-যোগ্য সিকিউরিটি কেনার কাজে ব্যবহার করা যাবে। তবে চুক্তিতে নির্ধারিত গ্রাহকের ইকুইটি ও মার্জিন অর্থায়নের ন্যূনতম অনুপাত বজায় থাকলে মার্জিন হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ থাকবে।
অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের জন্যও নতুন শর্ত
মার্জিন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের নামে পৃথক ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করতে হবে। ওই হিসাব শুধু মার্জিন অর্থায়ন-সংক্রান্ত কাজে ব্যবহার করা যাবে। কোনো শাখা অফিস বা ডিজিটাল বুথের নামে এ ধরনের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ থাকবে না।
একজন গ্রাহক একই অর্থায়নকারীর কাছে একই সময়ে একটি নগদ হিসাব ও একটি মার্জিন হিসাব রাখতে বা খুলতে পারবেন।
মার্জিন অর্থায়ন কার্যক্রমের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিটি অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানকে কমপক্ষে দুই সদস্যের একটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করতে হবে। কমিটিকে বছরে অন্তত চারটি সভা করতে হবে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের মার্জিন অর্থায়ন নীতিমালা প্রণয়নের সময় বিএসইসির বিধিমালার কোনো শর্ত শিথিল করতে পারবে না। আবার বিধিমালায় নেই—এমন নতুন কোনো শর্ত আরোপেরও সুযোগ থাকবে না।
গবেষণা দলের সদস্যদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সরাসরি ট্রেডিং কমিশন আয়ের সঙ্গে যুক্ত না রাখার বিধানও রাখা হয়েছে।
শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়ন
কোনো প্রতিষ্ঠান ইসলামিক শরিয়াহভিত্তিক মার্জিন অর্থায়ন চালু করতে চাইলে সেখানে শরিয়াহ সুপারভাইজারি বোর্ড থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ওই বোর্ড বা শরিয়াহ উপদেষ্টার সুপারিশের ভিত্তিতে প্রণয়ন ও পরিচালনা করতে হবে।
গেজেট প্রকাশের মধ্য দিয়ে এসব সংশোধনী এখন থেকে শেয়ারবাজারের মার্জিন অর্থায়ন কার্যক্রমে প্রযোজ্য হবে।