ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের পেছনে যে তিন কারণ

তীব্র গরমের মধ্যে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সারা দেশে লোডশেডিং পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রাজধানী ও শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। কোথাও এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকার পর দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত সরবরাহ বন্ধ থাকছে। আবার কোনো কোনো এলাকায় দিনে-রাতে মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে প্রচণ্ড গরমে মানুষের দুর্ভোগ বাড়ার পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে শিল্প উৎপাদন।
বিভিন্ন জেলার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দিনে-রাতেই ঘন ঘন বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
শিল্পাঞ্চলেও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব
গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতির প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কোনো কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথাও জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা।
নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, আগের দিন পর্যন্ত কিছুটা জ্বালানি সরবরাহ পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে কারখানাগুলোতে স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রে হামলা
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের ক্ষোভ কোথাও কোথাও সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ অফিস ও উপকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়েছে।
এতে বিদ্যুৎ বিভাগের স্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশন বুধবার পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে চিঠি দিয়েছে।
সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলোর আওতাধীন এলাকায় গড়ে ৮ থেকে ৯ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াট। ফলে অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে এবং কিছু স্থাপনা হামলার শিকার হচ্ছে।
এরই মধ্যে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে পল্লী বিদ্যুতের এরিয়া অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে। পার্বতীপুর জোনাল অফিসের আওতাধীন ভবের বাজার ইনডোর উপকেন্দ্রেও হামলা ও ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। গোপালগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। গোপালগঞ্জে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি—ওজোপাডিকোর পক্ষ থেকেও পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে।
লোড ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের নির্দেশ
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী, অফিস ও স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
একই সঙ্গে সব বিতরণ প্রতিষ্ঠানকে লোড ম্যানেজমেন্ট বা লোডশেডিংয়ের ক্ষেত্রে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো একটি এলাকায় অতিরিক্ত এবং অন্য এলাকায় তুলনামূলক কম লোডশেডিং না করে যতটা সম্ভব ভারসাম্য রেখে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনার কথা বলা হয়েছে।
উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও মিলছে না বিদ্যুৎ
বিদ্যুৎ সংকটের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি। দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। বিপরীতে কাগজে-কলমে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় বেশি হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি না পাওয়ায় সেই সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এর পাশাপাশি বিভিন্ন কারণে কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে মূলত তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সমস্যা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক জটিলতা।
এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটিতে গ্যাস সরবরাহ কমেছে
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় একটি অংশ গ্যাসনির্ভর। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৫২৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও মঙ্গলবার সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহের বড় ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ স্বাভাবিক উৎপাদন করতে পারছে না।
কয়লা ও আর্থিক সংকটও বড় কারণ
গ্যাসের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কিছু অংশেও জ্বালানি ও কারিগরি সমস্যায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বড়পুকুরিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি সমস্যার কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকার প্রভাব জাতীয় বিদ্যুৎ সরবরাহেও পড়ছে।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ আমদানিকারকদের কাছে সরকারের বড় অঙ্কের বকেয়া জমে থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি আমদানি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক চাপও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
৩,৭৫৭ মেগাওয়াট ঘাটতি হয়েছিল ১০ আগস্ট
গত ২৮ জুলাই থেকে দেশে লোডশেডিংয়ের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে শুরু করে। এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এক পর্যায়ে ১০ আগস্ট দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি বড় আকার ধারণ করে।
ওই দিন দুপুরে ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৫০৫ মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ঢাকা অঞ্চলে ৬ হাজার ৪৩২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে ৫৮৫ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। দেশের অন্যান্য বিভাগেও চাহিদার তুলনায় কম বিদ্যুৎ সরবরাহের তথ্য পাওয়া গেছে।
দ্রুত স্বাভাবিক হচ্ছে না পরিস্থিতি
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলমের মতে, এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত লোডশেডিং দ্রুত কমার সম্ভাবনা কম। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি সংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতিতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, ১১ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে একটি কৌশল নেওয়া হয়েছে এবং ১২ আগস্ট সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে পারেননি তিনি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পুরো সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন রাতারাতি বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতিতে আরও সময় প্রয়োজন হতে পারে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে মার্কেট বন্ধ রাত ৮টায়
চলমান সংকটের মধ্যে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধের সময়ও কমিয়েছে সরকার। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, দেশের সব শপিংমল, মার্কেট ও দোকান সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।
একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার পর সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ রাখতে এবং ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আলোকসজ্জা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
এর আগে ১১ জুনের নির্দেশনায় শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার অনুমতি ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে সময়সীমা এক ঘণ্টা কমিয়ে রাত ৮টা করা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলমান ও অনুষ্ঠিতব্য মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও রাত ৮টার মধ্যে শেষ করতে হবে। তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল, ওষুধের দোকানসহ জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠানগুলো এ সময়সীমার আওতামুক্ত থাকবে।
স্বস্তির অপেক্ষায় মানুষ
গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সমস্যা এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ও সরবরাহসংক্রান্ত জটিলতার কারণে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বর্তমানে বড় ধরনের চাপে রয়েছে।
তীব্র গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে শিল্প উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে গ্রাহকদের ক্ষোভ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে লোড ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে সংকটের বড় অংশই গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এলএনজি সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে।