শিশুশিল্পী থেকে বলিউডের প্রথম নারী সুপারস্টার, জন্মবার্ষিকীতে স্মরণ শ্রীদেবীকে

ভারতীয় চলচ্চিত্রে শ্রীদেবী শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ছিলেন না; তিনি ছিলেন এমন এক তারকা, যিনি নারী অভিনয়শিল্পীদের নিয়ে প্রচলিত ধারণাকেই বদলে দিয়েছিলেন। অসাধারণ অভিনয়, নৃত্য, অভিব্যক্তি ও পর্দায় অনন্য উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ‘মহিলা সুপারস্টার’ হিসেবে।
১৯৬৩ সালের ১৩ আগস্ট তামিলনাড়ুতে জন্মগ্রহণ করেন শ্রীদেবী। তাঁর আসল নাম শ্রী আম্মা ইয়াঙ্গার আয়্যাপ্পান। মাত্র চার বছর বয়সে শিশুশিল্পী হিসেবে অভিনয়ে পা রাখেন তিনি। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রে তামিলের পাশাপাশি তেলুগু, মালয়ালম ও কন্নড় ভাষার ছবিতেও কাজ করেন। ১৯৭১ সালে মালয়ালম ছবি ‘পুম্বাট্টা’র জন্য শিশুশিল্পী হিসেবে পুরস্কারও অর্জন করেন।
হিন্দি চলচ্চিত্রে শ্রীদেবীর অভিষেক হয় শিশুশিল্পী হিসেবে ‘জুলি’ ছবিতে। পরে ‘সোলহা সাওয়ান’ দিয়ে নায়িকা হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। তবে ‘হিম্মতওয়ালা’ ছবির সাফল্য তাঁকে বলিউডে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়। এরপর আশি ও নব্বইয়ের দশকে একের পর এক জনপ্রিয় ছবিতে অভিনয় করে তিনি হয়ে ওঠেন ভারতের অন্যতম শীর্ষ তারকা।
‘সদমা’, ‘মিস্টার ইন্ডিয়া’, ‘চাঁদনি’, ‘চালবাজ’, ‘লমহে’সহ বিভিন্ন ছবিতে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে নিজের বহুমাত্রিক প্রতিভার প্রমাণ দেন তিনি। কখনও আবেগপ্রবণ, কখনও হাস্যরসাত্মক, আবার কখনও দৃঢ়চেতা চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে।
বিশেষ করে ‘সদমা’ ছবিতে তাঁর অভিনয় দেখিয়েছিল, বাণিজ্যিক ছবির জনপ্রিয়তার পাশাপাশি গভীর ও চ্যালেঞ্জিং চরিত্রেও তিনি সমান দক্ষ। আর ‘চালবাজ’-এ দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে তিনি দেখিয়েছিলেন তাঁর অভিনয়ক্ষমতার ব্যাপ্তি কতটা।
‘মিস্টার ইন্ডিয়া’ ও ‘চাঁদনি’র গান এবং নৃত্যেও শ্রীদেবীর উপস্থিতি ছিল আলাদা আকর্ষণ। অনেক ছবিতেই তাঁর জনপ্রিয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, পর্দায় নায়কের পাশাপাশি তিনিই হয়ে উঠতেন মূল আকর্ষণ। এ কারণেই ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রথম নারী সুপারস্টারদের একজন হিসেবে তাঁর নাম আজও উচ্চারিত হয়।
১৯৯৬ সালে চলচ্চিত্র প্রযোজক বনি কপূরের সঙ্গে বিয়ে হয় শ্রীদেবীর। তাঁদের সম্পর্ক ও বিয়ে নিয়ে সে সময় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছিল। বনি কপূর তখন বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন মোনা শৌরী কপূর। ফলে শ্রীদেবীকে ঘিরে নানা বিতর্ক ও সমালোচনাও তৈরি হয়।
এর আগে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও গোপনে বিয়ের খবরও সংবাদমাধ্যমে আলোচিত হয়েছিল। তবে দুজনের কেউই প্রকাশ্যে বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। ফলে এটি দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রজগতের অন্যতম আলোচিত গুঞ্জন হিসেবেই থেকে যায়।
বনি কপূরের সঙ্গে বিয়ের পর ধীরে ধীরে অভিনয় থেকে দূরে সরে যান শ্রীদেবী। ১৯৯৭ সালে তাঁদের প্রথম সন্তান জাহ্নবী কপূর এবং ২০০০ সালে দ্বিতীয় সন্তান খুশি কপূরের জন্ম হয়।
ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল সময়ে দীর্ঘ বিরতি নিয়ে পরিবারকে সময় দেওয়ার সিদ্ধান্তটি ছিল শ্রীদেবীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এক সময়ের ব্যস্ততম অভিনেত্রী হয়ে তিনি সংসার ও সন্তানদের ঘিরেই জীবন কাটাতে শুরু করেন।
দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর ২০১২ সালে ‘ইংলিশ ভিংলিশ’ ছবির মাধ্যমে বড় পর্দায় ফেরেন শ্রীদেবী। প্রত্যাবর্তনের পরও তাঁর অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের প্রশংসা কুড়ায়। ছবিতে সাধারণ এক গৃহবধূর আত্মমর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্পে তাঁর অভিনয় নতুন প্রজন্মের দর্শকদের কাছেও তাঁকে পরিচিত করে তোলে।
এরপর ২০১৭ সালে ‘মম’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। এটি ছিল তাঁর শেষ পূর্ণাঙ্গ হিন্দি চলচ্চিত্র। মেয়েকে রক্ষা করতে একজন মায়ের লড়াইয়ের গল্পে শ্রীদেবীর অভিনয় আবারও প্রমাণ করে, বয়স বাড়লেও তাঁর অভিনয়ের শক্তি এতটুকুও কমেনি।
২০১৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি আকস্মিক মৃত্যু হয় শ্রীদেবীর। দুবাইয়ে স্বামীর ভাইঝির বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে একটি হোটেলের বাথটবে তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৫৪ বছর।
তাঁর আকস্মিক মৃত্যু ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে গভীর শোকের সৃষ্টি করে। পরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয়।
মায়ের মৃত্যুর পর তাঁর দুই মেয়ে জাহ্নবী ও খুশি কপূরও চলচ্চিত্রে পা রাখেন। জাহ্নবীর অভিষেক হয় ‘ধড়ক’ ছবির মাধ্যমে। অন্যদিকে খুশি অভিনয়ে আত্মপ্রকাশ করেন ‘দ্য আর্চিজ’ ছবির মাধ্যমে।
মায়ের মতো তাঁদের পথও এখন আলোচনায়। অভিনয়ের পাশাপাশি প্রায়ই তাঁদের শ্রীদেবীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। তবে দুজনেই নিজেদের অভিনয়শৈলী ও পরিচয় গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন।
শ্রীদেবীর সম্পত্তির মধ্যে চেন্নাইয়ের বাড়ি ও জমির কথা বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তবে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের পূর্ণ ও নির্ভরযোগ্য তালিকা প্রকাশ্যে নেই। বস্তুগত সম্পদের বাইরেও তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার তাঁর চলচ্চিত্র ও অভিনয়।
শিশুশিল্পী হিসেবে শুরু করে দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা পেরিয়ে বলিউডের শীর্ষে ওঠা, দীর্ঘ বিরতি নিয়ে আবারও শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন এবং মাত্র ৫৪ বছরে আকস্মিক বিদায়—শ্রীদেবীর জীবন তাই ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। আজও তাঁর অভিনয়, নাচ ও পর্দার উপস্থিতি তাঁকে প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শকের কাছে স্মরণীয় করে রেখেছে।