১৮ জুলাইয়ের শহীদ ফারহান ফাইয়াজ, ইতিহাসে অমর এক কিশোর

২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাল দিনে রাজধানীর ধানমন্ডিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ ফারহানুল ইসলাম ভূঁইয়া, যিনি সবার কাছে ফারহান ফাইয়াজ নামে পরিচিত। মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্রাণ হারানো এই শিক্ষার্থী জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম কনিষ্ঠ শহীদ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নিয়েছেন।
তার আত্মত্যাগের স্মরণে রাজধানীর ধানমন্ডির পুরোনো ২৭ নম্বর সড়কের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ সড়ক’। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আনুষ্ঠানিকভাবে সড়কটির নামফলক উন্মোচন করেছে।
এছাড়া জাতীয় সংসদ ভবনের পশ্চিম পাশে শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের জন্য নির্মিত একটি খেলার মাঠের নামও রাখা হয়েছে ‘শহীদ ফারহান ফাইয়াজ খেলার মাঠ’। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের যৌথ উদ্যোগে ২০২৪ সালের নভেম্বরে মাঠটি উদ্বোধন করা হয়।
ফারহান ছিলেন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী। ২০২৫ সালে তার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ভবিষ্যতে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হতে চেয়েছিলেন। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়ে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের পর দেশে ফিরে বাংলাদেশের উন্নয়নে কাজ করার স্বপ্ন ছিল তার।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুলাই সকালে বন্ধুদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিতে ধানমন্ডিতে যান ফারহান।
বিকেলে ধানমন্ডির পুরোনো ২৭ নম্বর সড়কে রাপা প্লাজা ও জেনেটিক প্লাজার মধ্যবর্তী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। সহপাঠীরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করলেও পথেই তার মৃত্যু হয়।
ফারহানের মৃত্যুতে তার পরিবার গভীর শোকাহত হয়ে পড়ে।
তার বাবা শহিদুল ইসলাম বলেন, একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে পরিবারের স্বাভাবিক জীবন থমকে গেছে। মা ফারহানা দিবা ছেলের হত্যার বিচার দাবি করেন। বোন সায়ীমা ইসলামও ভাইকে হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরেন।
বন্ধু ও সহপাঠীদের কাছে ফারহান ছিলেন প্রাণবন্ত, দায়িত্বশীল এবং নেতৃত্বগুণসম্পন্ন একজন শিক্ষার্থী। লেখাপড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। নতুন কিছু শেখা, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখাই ছিল তার স্বভাব।
ফারহান বিশ্বাস করতেন, মানুষের জীবন এমন হওয়া উচিত, যা মৃত্যুর পরও মানুষ মনে রাখে।
মৃত্যুর আগে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বায়োতে তিনি জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আভিচির The Nights গানের একটি লাইন লিখেছিলেন, যার মর্মার্থ ছিল— এমন জীবন গড়ে তোলো, যা মানুষ মৃত্যুর পরও মনে রাখবে।
অনেকের মতে, নিজের সেই বিশ্বাসেরই বাস্তব প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন ফারহান ফাইয়াজ।
ফারহানের মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা শহিদুল ইসলাম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় শেখ হাসিনাসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা ও গণহত্যার অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তৎকালীন সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, রাজনৈতিক নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তার নামও উল্লেখ করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে ফারহান ফাইয়াজের আত্মত্যাগ একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তার নামে সড়ক ও খেলার মাঠ নামকরণ নতুন প্রজন্মের কাছে তার অবদান ও আত্মত্যাগের স্মৃতি বহন করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।