শি-ট্রাম্প বৈঠকে কূটনৈতিক উষ্ণতা, তবে বাণিজ্য ও তাইওয়ান ইস্যুতে রয়ে গেল টানাপোড়েন

বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতি বর্তমানে এক অস্থির সময় পার করছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র-চীনের বাণিজ্য উত্তেজনা বিশ্ববাজারে দীর্ঘদিন ধরেই চাপ সৃষ্টি করে আসছে। এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। বিশ্লেষকদের আশা ছিল, বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনীতির এই বৈঠক বৈশ্বিক স্থিতিশীলতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং তার জবাবে চীনের পাল্টা পদক্ষেপ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য যুদ্ধকে আরও তীব্র করে তোলে। বিরল খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে বেইজিংও ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে জটিলতা বিশ্ব অর্থনীতিকে আরও অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে।
এমন প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত ট্রাম্প-শি বৈঠকে বাণিজ্য, ইরান এবং তাইওয়ান ইস্যু সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। যদিও দুই দেশের মধ্যে কিছু বাণিজ্যিক অগ্রগতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বিরোধগুলো এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্পষ্টভাবে ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান ইস্যু সঠিকভাবে মোকাবিলা না করা হলে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক সংঘাতের দিকে যেতে পারে। তিনি বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
স্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান নিজেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে দাবি করলেও চীন এটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ মনে করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে তাইওয়ানকে রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে, যা নিয়ে বেইজিংয়ের আপত্তি রয়েছে।
বৈঠকের আগে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানবিরোধী অবস্থানেরও সমালোচনা করে। চীন জানায়, চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং তারা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পক্ষে।
বৈঠক শেষে ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান ইস্যুতে দুই দেশের অবস্থান অনেকটাই কাছাকাছি এসেছে। তবে এ বিষয়ে শি জিনপিং প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। মার্কিন কর্মকর্তারা আশা প্রকাশ করেন, চীন তার প্রভাব ব্যবহার করে ইরানকে সমঝোতার পথে আনতে ভূমিকা রাখবে এবং হরমুজ প্রণালি সচল রাখতে সহযোগিতা করবে।
বাণিজ্য ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে কিছু সমঝোতার ইঙ্গিত মিলেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, কৃষিপণ্য বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা এগিয়েছে। প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের কিছু অ-সংবেদনশীল পণ্য নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, চীন প্রায় ২০০টি বিমান কেনার বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে, যা বোয়িংয়ের জন্য বড় অর্ডার হতে পারে। তবে বাজার বিশ্লেষকদের প্রত্যাশা ছিল আরও বড় পরিসরের চুক্তি। ফলে বিনিয়োগকারীদের হতাশায় বোয়িংয়ের শেয়ারের দাম কমে যায়। একইভাবে চীনের শেয়ারবাজারেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
যদিও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে মতভেদ রয়ে গেছে, তবুও দুই নেতার বৈঠকে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ট্রাম্পকে বিশেষভাবে বেইজিংয়ের একটি ঐতিহাসিক বাগান ঘুরিয়ে দেখান এবং তার সম্মানে আয়োজন করা হয় জাঁকজমকপূর্ণ নৈশভোজের।
২০১৭ সালের পর এই প্রথম চীন সফরে গিয়ে ট্রাম্পকে লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয় বেইজিং। সফরে তার সঙ্গে ছিলেন মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও করপোরেট নেতারা।
চীন সফরে ট্রাম্প প্রকাশ্যে দেশটির প্রশংসা করে বলেন, “আমি চীনকে দেখে সত্যিই মুগ্ধ।” পাশাপাশি তিনি শি জিনপিংকে আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউজ সফরের আমন্ত্রণ জানান। যদিও এখনো বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে সেই আমন্ত্রণ গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।