ঈদযাত্রায় ট্রেনের সংকট ও পরিকল্পনাহীনতার দায়

প্রতি বছর ঈদ আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করতে লাখো মানুষ রাজধানী ও বড় শহর ছেড়ে ছুটে যান গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সাধারণ মানুষের জন্য এই আনন্দ অনেক সময়ই বিষাদে রূপ নেয় রেলের টিকিট সংকট এবং যাতায়াতের চরম ভোগান্তির কারণে। আসন্ন ঈদুল ফিতরকে ঘিরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘বিশেষ ট্রেন’ পরিচালনার সিদ্ধান্ত সেই পুরোনো বাস্তবতার কথাই আবারও সামনে এনে দিয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেলের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ হয়েছে, নতুন রেলপথ চালু হয়েছে এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কথাও শোনা গেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র হলো—যাত্রীসেবার মান ও সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তা কমেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কয়েক বছর আগেও ঈদযাত্রায় যেখানে ৮ থেকে ১০ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালু করা হতো, সেখানে গত বছরের মতো এবারও মাত্র ৫ জোড়া বিশেষ ট্রেনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে এই সেবা।
রেলওয়ের এই সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়াবে। কারণ ঈদের সময় ট্রেনে যাত্রীচাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। টিকিট পাওয়া যেমন কঠিন হয়ে পড়ে, তেমনি টিকিট থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের অনেক সময় ভিড় ঠেলে নির্ধারিত আসনে পৌঁছাতে হিমশিম খেতে হয়। অতীতে বহুবার দেখা গেছে, অতিরিক্ত যাত্রীচাপের কারণে মানুষ ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে চড়ে যাতায়াত করতে বাধ্য হয়েছেন। এটি শুধু দুর্ভোগই নয়, নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
রেল কর্তৃপক্ষ ইঞ্জিন সংকট এবং ঈদের ছুটি দীর্ঘ হওয়াকে বিশেষ ট্রেন না বাড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কিন্তু যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যার মূল কারণ পরিকল্পনার ঘাটতি। দীর্ঘদিন ধরে রেলের ইঞ্জিন ও কোচের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি। উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে মৌলিক চাহিদাগুলো অনেকটাই উপেক্ষিত থেকেছে। ফলে যাত্রীসংখ্যা বাড়লেও রেলের সক্ষমতা সেই অনুপাতে বাড়েনি।
বাসভাড়ার উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য ট্রেনই সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য পরিবহন মাধ্যম। বিশেষ করে ঈদযাত্রায় এই নির্ভরতা আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু যখন এই প্রধান ভরসার জায়গাটিতেই সংকট তৈরি হয়, তখন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
রেলওয়েকে কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ইঞ্জিন ও কোচ বাড়ানো, সময়োপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী ট্রেন পরিচালনার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় প্রতি ঈদেই ট্রেনের ছাদে যাত্রা, স্টেশনে উপচে পড়া ভিড় এবং টিকিট সংকট—এই পুরোনো দৃশ্যই আমাদের সামনে ফিরে আসবে।
ঈদ আনন্দের উৎসব। এই আনন্দ যেন যাত্রাপথের দুর্ভোগে ম্লান না হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সময় এসেছে রেল ব্যবস্থাপনাকে আরও কার্যকর, পরিকল্পিত এবং যাত্রীবান্ধব করে তোলার।