ঈশ্বরগঞ্জে ধানক্ষেত থেকে পরিত্যক্ত নবজাতক কন্যা উদ্ধার

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে সড়কের পাশের একটি ধানক্ষেত থেকে সদ্যোজাত এক কন্যাশিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১০ মার্চ) সন্ধ্যার পর উপজেলার ঈশ্বরগঞ্জ ইউনিয়নের খৈরাটি গ্রামে ময়মনসিংহ–কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের পাশে শিশুটিকে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। ঘটনাটি এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে এবং সমাজে নবজাতক পরিত্যাগের প্রবণতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যার দিকে রাস্তার পাশের ধানক্ষেত থেকে শিশুর কান্নার শব্দ শুনে এক পথচারী বিষয়টি স্থানীয় অটোরিকশা চালক মো. আব্দুল হালিমকে জানান। খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে ধানক্ষেতে পড়ে থাকা সদ্যোজাত কন্যাশিশুটিকে উদ্ধার করেন। পরে শিশুটিকে নিজের বাড়িতে নিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে প্রাথমিকভাবে নিরাপদে রাখেন।
এরপর তিনি বিষয়টি ঈশ্বরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস ও প্রশাসনকে অবহিত করেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটিকে উদ্ধার করে ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। উদ্ধার করার সময় শিশুটির শরীরে রক্তের চিহ্ন ছিল বলে জানা গেছে।
ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. আলী আরবাব চৌধুরী জানান, প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে শিশুটিকে ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে জন্মের তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই তাকে সেখানে ফেলে যাওয়া হয়েছিল। বর্তমানে শিশুটি সুস্থ রয়েছে।
ঘটনার খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা রহমান হাসপাতালে গিয়ে শিশুটির খোঁজখবর নেন। তিনি জানান, শিশুটির চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে শিশুটিকে উদ্ধারকারী অটোরিকশা চালক আব্দুল হালিম ও তার স্ত্রী মজিদা খাতুন শিশুটির প্রতি গভীর মমতা প্রকাশ করেছেন। মানবিক কারণে তারা শিশুটিকে নিজেদের কাছে রেখে লালন-পালন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দত্তক নেওয়ার ইচ্ছাও জানিয়েছেন।
আব্দুল হালিম বলেন, “ধানক্ষেতে শিশুটির কান্না শুনে আমি আর স্থির থাকতে পারিনি। আমার স্ত্রীও তাকে খুব আদর করছে। আমরা চাই এই মেয়েটি আমাদের ঘরেই বড় হোক।”
প্রশাসন জানিয়েছে, আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন সাপেক্ষে শিশুটির অভিভাবকত্ব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু মানবিক সংকট নয়; এর পেছনে কাজ করে নানা সামাজিক ও অপরাধতাত্ত্বিক বাস্তবতা। অবৈধ সম্পর্কের সামাজিক লজ্জা, দারিদ্র্য, কন্যাশিশু জন্ম নিয়ে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা পারিবারিক সহিংসতা অনেক সময় নবজাতক পরিত্যাগের মতো অপরাধকে উসকে দেয়।
অপরাধতত্ত্বে এটিকে “নবজাতক পরিত্যাগ” বা child abandonment হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা সামাজিক নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা ও সামাজিক চাপের ফল হিসেবে দেখা হয়।
সচেতন মহলের মতে, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা, মাতৃত্বকালীন সহায়তা এবং কন্যাশিশু নিয়ে বৈষম্যমূলক মানসিকতার পরিবর্তন জরুরি। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ ছাড়া এমন ঘটনা বন্ধ করা কঠিন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।