এলপিজি সংকট: বাজারে অবসান কবে?

দেশের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য জ্বালানি এলপিজি গ্যাস। রান্না, শিল্প উৎপাদন, ছোট-বড় ব্যবসা—সবকিছুই এর উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে জাহাজ ভাড়ার বৃদ্ধির পাশাপাশি আমদানিতে জটিলতা ও কমিশন সংকটের কারণে বর্তমান সময়ে এলপিজির বাজারে অস্থিরতা যেন দৈনন্দিনের নিত্যসংঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি দরের চেয়ে সিলিন্ডারপ্রতি কয়েকশ টাকা অতিরিক্ত খরচ করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদের।
গত বছরের নভেম্বরে এলপিজির আমদানি ৪৪ শতাংশ কমে যাওয়ার প্রভাব এখনও কাটিয়ে ওঠা যায়নি। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতেও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। রমজান শুরু হলেও পরিস্থিতি কোনো উল্লেখযোগ্যভাবে স্থিতিশীল হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সরকার-নির্ধারিত ১৩৪১ টাকার সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকায়, আবার কোথাও ১৮০০ বা দুই হাজার টাকায়ও।
এলপিজি খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রিমিয়াম ভাড়া ১৬০ ডলার হলেও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) তা ১২০ ডলারে হিসাব করছে। ফলে কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ পড়ছে, যা ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে কমিশন কমিয়ে দিতে বাধ্য করছে। সেই চাপ সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ছে।
এলপিজি সংকট শুধু সংখ্যা বা সরবরাহের হিসাবের বিষয় নয়। এটি সরকারি মনিটরিং, পরিকল্পনা এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের অভাবও প্রদর্শন করছে। সাধারণ ভোক্তা দিনরাতের খাবারের জন্য একপ্রকার উপেক্ষা করতে বাধ্য হচ্ছেন, আর সরবরাহকারী কোম্পানি বা ডিলাররা অস্পষ্ট নিয়মে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারের অবশ্যই বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে হবে। শুধু বেসরকারি খাতের উপর ছেড়ে দিলে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে। বিপিসিকে অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ সরবরাহের দায়িত্ব নিতে হবে। স্টোরেজ ক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ছোটখাট অস্থিরতা মোকাবিলাও সম্ভব। এছাড়া কমিশন এবং ভর্তুকি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা আনতে হবে, যাতে মূল্যবৃদ্ধি আর ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা না পড়ে।
এলপিজি সংকট কেবল এক প্রকার বাজার সমস্যা নয়; এটি ভোক্তার অধিকার, সরকারের নিয়ন্ত্রণযোগ্যতা এবং জরুরি নীতি নির্ধারণের সক্ষমতার পরীক্ষা। যত দ্রুত হোক, সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে, না হলে ঈদ পরবর্তী সময় নাগালে বাজারে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সর্বোপরি, এই সংকট থেকে শিক্ষা নিতে হবে—জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা এবং বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত না হলে সাধারণ ভোক্তারা সর্বদা ভোগান্তিতে পড়বেন। এলপিজির বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এখনই সময় ব্যবস্থা নেওয়ার।