জ্বালানি সংকট নেই, তবে উদ্বেগ আছে

ঢাকায় ফিলিং স্টেশনের সামনে দীর্ঘ লাইন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, এবং তেলবিহীন ফিরে আসা—এখানেই প্রতিফলিত হচ্ছে বাংলাদেশের নাগরিকদের উদ্বেগ। রাজধানীর বিভিন্ন অঞ্চলে—উত্তর বাড্ডা, রামপুরা, খিলক্ষেত—ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য মানুষ অপেক্ষা করছেন, এবং অনেকেই শেষ পর্যন্ত তেল না পেয়ে হতাশ। বাইক চালক হায়দার আলী বলেন, গত রাতে দুই ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করেও তেল পাইনি। মনে হচ্ছিল যেন যুদ্ধ ইরানে নয়, বাংলাদেশে শুরু হয়েছে।
সরকার বারবার আশ্বাস দিচ্ছে, “সংকট নেই।” বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় যানবাহনভেদে দৈনিক তেলের বরাদ্দ জারি করেছে। মোটরসাইকেল দুই লিটার, প্রাইভেটকার ১০ লিটার, জিপ ও মাইক্রোবাস ২০–২৫ লিটার, পিকআপ ও লোকাল বাস ৭০–৮০ লিটার এবং দূরপাল্লার বাস ও ট্রাক ২০০–২২০ লিটার তেল নিতে পারবে। ফিলিং স্টেশনে ক্রয় রশিদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং মজুদের হিসাব ডিপোতে জানাতে হবে।
তবে, বাস্তব চিত্র আরও জটিল। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের খবরের প্রভাবে মানুষ আগেভাগেই তেল মজুদ করছেন। ফিলিং স্টেশন ও ডিপো থেকেও কৃত্রিম সংকট তৈরি করার অভিযোগ আছে। ফলে, সরবরাহ ঠিক থাকলেও মানুষ অসন্তুষ্ট এবং ভয় ও বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ বা যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আন্তর্জাতিক তেলের সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশের মতো তেল আমদানি নির্ভর দেশগুলোতে এতে সরবরাহ সংকট ও মূল্য বৃদ্ধি দেখা দিতে পারে। পোশাক শিল্পের ব্যবসায়ীও সতর্ক করেছেন, শিপিং সমস্যার কারণে রপ্তানি পণ্য বিলম্বিত হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদনের জন্য হুমকি।
সরকার ইতোমধ্যেই রেশনিং ও বিকল্প জ্বালানি উৎস নিয়ে আলোচনা করছে। তেল এবং গ্যাস সাশ্রয়ের নির্দেশনা জারি হয়েছে—গণপরিবহন ব্যবহার, রান্না ও অন্যান্য কাজে সাশ্রয়, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি খরচ কমানো। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও এলপিজি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করছে।
তবে সমস্যার মূলনীতি হল, জনগণকে সচেতন না করা এবং বাজারে কৃত্রিম সংকটের সুযোগ। শুধু বরাদ্দ জারি করলেই হবে না, প্রতিটি ফিলিং স্টেশন, ডিপো ও ব্যবসায়ীকে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সক্রিয় রাখতে হবে। পাশাপাশি জনগণকে প্যানিক বাইং না করতে উৎসাহিত করা জরুরি।
অর্থনীতিবিদরা আরও পরামর্শ দিচ্ছেন—বিকল্প জ্বালানি উৎস খোঁজা, আমদানি উৎস বহুমুখীকরণ, কৌশলগত মজুদ বৃদ্ধি এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো। এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ এখনই নেওয়া গেলে দেশের সম্ভাব্য বড় সংকট সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
সংক্ষেপে, ঢাকার ফিলিং স্টেশনের ভোগান্তি শুধু সরবরাহের স্বাভাবিক চাপ নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা, যা প্রমাণ করে, সরকারকে আরও কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। কেবল সরবরাহ বজায় রাখলেই হবে না, জনগণের আস্থা ফিরে আনতেও পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য। ভবিষ্যতের সম্ভাব্য জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।